ঢাকা | আগস্ট ২, ২০২৬ - ৬:৩৫ অপরাহ্ন

শিরোনাম

দুদকের অনুসন্ধানে ৯৮১ কোটি টাকার গ্যাস বিল অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা

  • আপডেট: Sunday, August 2, 2026 - 12:28 pm
  • পঠিত হয়েছে: 3 বার

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠী ইউনাইটেড গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে গ্যাস বিল বাবদ প্রায় ৯৮১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা পরিশোধ না করে আত্মসাতের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আদালতে দাখিল করা অনুসন্ধান অগ্রগতি প্রতিবেদনে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, কমিশনের উপ-পরিচালক (বিসি অনুঃ ও তদন্ত-১) মো. জাহাঙ্গীর আলম আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, প্রতিষ্ঠানটি ক্যাপাসিটি রেটের পরিবর্তে বেআইনিভাবে আইপিপি (IPP) রেটের সুবিধা গ্রহণ করে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল অঙ্কের গ্যাস বিল পরিশোধ না করায় রাষ্ট্রীয় রাজস্বের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।

চারটি অভিযোগে একযোগে অনুসন্ধান

দুদকের অনুসন্ধানে শুধু গ্যাস বিলের অনিয়মই নয়, ইউনাইটেড গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈন উদ্দিন হাসান রশিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—

  • জাল দলিলের মাধ্যমে সরকারি অর্পিত সম্পত্তি দখল,
  • অবৈধ সম্পদ অর্জন,
  • বিদেশে অর্থ পাচার,
  • গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে অনিয়ম এবং সরকারি রাজস্ব আত্মসাত।

দুদক বলছে, অভিযোগগুলো পরস্পর সংশ্লিষ্ট হওয়ায় একত্রে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

বিভিন্ন সংস্থার নথি পর্যালোচনা

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় নথি ও তথ্য সংগ্রহ করেছে দুদক।

এসব নথি বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে, ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড নিয়ম অনুযায়ী প্রযোজ্য ক্যাপাসিটি রেট পরিশোধ না করে আইপিপি রেটের সুবিধা গ্রহণ করেছে, যার ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল পরিমাণ গ্যাস বিল বকেয়া রয়েছে।

তিতাস ও কর্ণফুলী গ্যাসে বিপুল বকেয়া:

দুদকের অনুসন্ধান অনুযায়ী—

  • তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কাছে জানুয়ারি ২০১৮ থেকে মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত বকেয়া রয়েছে ৪৮৬ কোটি ৪৩ লাখ ৮২ হাজার ৬১১ টাকা ৭৫ পয়সা।
  • কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কাছে অক্টোবর ২০১৮ থেকে নভেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত বকেয়া রয়েছে ৪৯৫ কোটি ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৪০৪ টাকা।

দুই প্রতিষ্ঠানের মোট বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৮১ কোটি ৬৭ লাখ ৮০ হাজার ১৫ টাকা ৭৫ পয়সা।

কীভাবে হয়েছে অনিয়ম?

দুদকের অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য গ্যাসের মূল্য নির্ধারণে নির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ইউনাইটেড পাওয়ার নির্ধারিত ক্যাপাসিটি রেটের পরিবর্তে আইপিপি রেটের সুবিধা গ্রহণ করে কম অর্থ পরিশোধ করেছে। এর ফলে বছরের পর বছর বিপুল অঙ্কের বিল বকেয়া থেকে যায় এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ক্ষতির মুখে পড়ে।

তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত শেষ হওয়ার পরই জানা যাবে।

আদালতে যা বলেছে দুদক:

আদালতে জমা দেওয়া অগ্রগতি প্রতিবেদনে দুদক জানিয়েছে, অনুসন্ধানে অভিযোগগুলোর প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। আরও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গ্রহণ এবং নথিপত্র যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।

মামলা হতে পারে:

দুদক সূত্র জানিয়েছে, অনুসন্ধান শেষ হলে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত হলে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনসহ সংশ্লিষ্ট আইনে মামলা দায়ের এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

আলোচনায় ইউনাইটেড গ্রুপ:

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ইউনাইটেড গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গ্যাস বিল বকেয়া, সরকারি সম্পত্তি দখল, অর্থপাচার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো অভিযোগ সামনে আসায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দুদকের অনুসন্ধান শেষ হলে অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। বর্তমানে তদন্ত চলমান থাকায় অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ এখনো হয়নি।