ঢাকা | জুলাই ২৯, ২০২৬ - ৮:৩৫ অপরাহ্ন

শিরোনাম

রাজধানীতে বিউটি পার্লারের ছড়াছড়ি, আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন

  • আপডেট: Wednesday, July 29, 2026 - 11:23 am
  • পঠিত হয়েছে: 5 বার

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানী ঢাকায় দ্রুত বাড়ছে বিউটি পার্লার, অ্যাসথেটিক সেন্টার ও বিউটি ট্রেনিং প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। সৌন্দর্যসেবা থেকে শুরু করে লেজার ট্রিটমেন্ট, স্কিন কেয়ার এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের প্রচারণা চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়িক অনুমোদন, ভবনের ব্যবহার, ব্যবহৃত প্রসাধনীর মান, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, গ্রাহকের ছবি-ভিডিও ব্যবহারের সম্মতি এবং ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধসহ নানা বিষয়ে প্রশ্নও উঠছে। রাজধানীর পান্থপথ এলাকায় পরিচালিত ‘Glow Touch’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেও এমন কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে প্রকাশিত তথ্য, প্রচারসামগ্রী ও দৃশ্যমান কার্যক্রমের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, রাজধানীর শমরিতা হাসপাতাল সংলগ্ন ‘গ্লো টাচ’ (Glow Touch) নামে একটি বিউটি পার্লার (ঠিকানা: ৪৪/এফ/৮এ, পান্থপথ, ঢাকা, যোগাযোগ: ০১৭৯৬-৫৮৭৯৬০) তাদের ফেসবুক পেজে চমকপ্রদ বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে গ্রাহক আকর্ষণ করছে

প্রতিষ্ঠানটির প্রচারণায় ‘Glow Touch Aesthetic and Training Center’ পরিচয় ব্যবহার করা হচ্ছে: 

ফেসবুক পেজে Laser Hair Removal, Party Makeup, Permanent Tattoo, Permanent Mole Remove, Permanent Lip Colour, Permanent Eyebrows, Permanent Tattoo Remove, Permanent Hair Remove, BB Glow Facial, Hydra Facial, Carbon Hollywood Facial ও Hair Extensionসহ বিভিন্ন সেবার প্রচারণা রয়েছে।

একই সঙ্গে স্কিন, হেয়ার, লেজার ও মেকওভার বিষয়ে প্রশিক্ষণের কথাও প্রচার করা হচ্ছে। ‘Professional Training’, ‘Expert Trainers’ এবং ‘Hands-on Practical Learning’-এর মতো তথ্যও রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির প্রচারসামগ্রীতে। এতে প্রশ্ন উঠছে—প্রতিষ্ঠানটি কেবল বিউটি পার্লার হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি অ্যাসথেটিক ও লেজারভিত্তিক বিশেষায়িত সেবাও দিচ্ছে? এসব সেবার ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় অনুমোদন, প্রশিক্ষিত জনবল, নিরাপত্তাব্যবস্থা ও প্রযোজ্য বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের অনুমোদন আছে কি?

প্রতিষ্ঠানটি যে ভবনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, ভবনটি আবাসিক নাকি বাণিজ্যিক হিসেবে অনুমোদিত—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যদি ভবনটি আবাসিক ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত হয়ে থাকে, সেখানে বিউটি পার্লার বা অ্যাসথেটিক সেন্টারের মতো বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার, ট্রেড লাইসেন্স, সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের নথি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা করলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হলে অগ্নিনিরাপত্তা, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা, পার্কিং, পরিবেশ এবং আশপাশের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব—এসব বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

লেজার ও অ্যাসথেটিক সেবায় নিরাপত্তা কতটা?

Glow Touch-এর প্রচারণায় লেজার হেয়ার রিমুভাল, মোল রিমুভাল, পার্মানেন্ট লিপ কালার ও পার্মানেন্ট আইব্রোজের মতো সেবার উল্লেখ রয়েছে। এসব সেবায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির মান, পরিচালনাকারীদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা এবং গ্রাহকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কারণ ত্বক ও শরীরে সরাসরি প্রভাব ফেলে এমন সেবার ক্ষেত্রে সামান্য ভুলও গ্রাহকের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত প্রয়োজনীয় অনুমোদন, যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা এবং সেবা প্রদানকারীদের যোগ্যতা যাচাই করা।

প্রসাধনীর বৈধতা ও মান নিয়ে প্রশ্ন: 

প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজে বিভিন্ন ধরনের স্কিন কেয়ার পণ্য, বোতলজাত প্রসাধনী এবং অ্যাম্পুল বা ভায়ালজাত পণ্যের ছবিও প্রচার করা হয়েছে। তবে ছবির ভিত্তিতে এসব পণ্যের উৎপাদনকারী বা আমদানিকারক, ব্যাচ নম্বর, মেয়াদ, বৈধ উৎস কিংবা প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

গ্রাহকের ত্বকে সরাসরি ব্যবহার করা এসব পণ্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো পণ্য বাধ্যতামূলক মাননিয়ন্ত্রণের আওতায় পড়ে কি না, বৈধভাবে আমদানি করা হয়েছে কি না এবং বাজারজাতের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করা হয়েছে কি না—তা পরীক্ষা করা জরুরি।

বিশেষ করে কোনো পণ্য বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক মানের আওতায় পড়ে কি না, বৈধভাবে আমদানি করা হয়েছে কি না এবং বাজারজাতের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করা হয়েছে কি না—তা যাচাই করা প্রয়োজন।

‘Aesthetic and Training Center’ পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন

প্রতিষ্ঠানটি বিউটি সার্ভিসের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার কথাও প্রচার করছে। ফলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ পরিচালিত হলে প্রশিক্ষকদের যোগ্যতা, প্রশিক্ষণের সিলেবাস, প্রশিক্ষণ শেষে দেওয়া সনদের গ্রহণযোগ্যতা এবং কোনো সরকারি বা স্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন রয়েছে কি না—এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

ফেসবুক পেজের ঠিকানা ও সরকারি নথি একই কি না

প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজ ও প্রচারসামগ্রীতে পান্থপথ, ঢাকার একটি ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দেওয়া হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ফেসবুক পেজে দেওয়া ঠিকানা, প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড এবং ট্রেড লাইসেন্স বা সরকারি নথিতে নিবন্ধিত ঠিকানা একই কি না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এ বিষয়টিও যাচাই করা। পাশাপাশি ভবনটির ব্যবহার অনুমোদন এবং সেখানে বিউটি পার্লার ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

গ্রাহকের ছবি-ভিডিও ব্যবহারে সম্মতি নেওয়া হচ্ছে তো?

প্রতিষ্ঠানটির ফেসবুক পেজ ও বিভিন্ন ‘Highlights’-এ সৌন্দর্যসেবা গ্রহণকারী ব্যক্তিদের ছবি ও ভিডিও দেখা যায়। এসব ছবি বা ভিডিও ব্যবসায়িক প্রচারণায় ব্যবহারের আগে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের স্পষ্ট সম্মতি নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষ করে সেবার আগে ও পরের ছবি, ব্যক্তিগত তথ্য কিংবা ভিডিও প্রচারের ক্ষেত্রে গ্রাহকের গোপনীয়তা ও ব্যক্তিগত অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

ভ্যাট-ট্যাক্সের হিসাবও যাচাইয়ের দাবি:

প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সৌন্দর্যসেবা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার কথা প্রচার করছে। ফলে ট্রেড লাইসেন্স, ই-টিআইএন, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ভ্যাট নিবন্ধন, আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং ভ্যাট রিটার্ন যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও দাখিল করা হচ্ছে কি না—তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। তবে নথিপত্র পরীক্ষা ছাড়া প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট-ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি যাচাইয়ের মাধ্যমেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

শুধু Glow Touch নয়, নজরদারি প্রয়োজন পুরো খাতে:

সংশ্লিষ্টদের মতে, রাজধানীতে দ্রুত বাড়তে থাকা বিউটি পার্লার ও অ্যাসথেটিক সেন্টারগুলোর ক্ষেত্রে নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। ট্রেড লাইসেন্স, ভবনের ব্যবহার অনুমোদন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের বৈধতা, কর্মীদের যোগ্যতা, ব্যবহৃত প্রসাধনীর মান ও উৎস, গ্রাহকের তথ্যের গোপনীয়তা, বিজ্ঞাপনের সত্যতা এবং ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ—সব বিষয়েই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত নজরদারি থাকা দরকার। বিশেষ করে লেজার বা ত্বকে সরাসরি প্রভাব ফেলে এমন সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

Glow Touch কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

এসব বিষয়ে Glow Touch কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবহৃত প্রসাধনীর অনুমোদন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের বৈধতা, ব্যবসায়িক নিবন্ধন, ভবনের ব্যবহার অনুমোদন, গ্রাহকের ছবি ব্যবহারের সম্মতি এবং ভ্যাট-ট্যাক্স সংক্রান্ত নথি সম্পর্কে তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।

নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি: 

সংশ্লিষ্টদের দাবি, সিটি করপোরেশন, বিএসটিআই, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নথিপত্র যাচাই করলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। কারণ সৌন্দর্যসেবা এখন শুধু প্রসাধনী ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নেই; লেজার, স্কিন কেয়ার ও বিভিন্ন অ্যাসথেটিক সেবা যুক্ত হওয়ায় এ খাতে নিরাপত্তা, দক্ষতা, অনুমোদন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কোনো প্রতিষ্ঠানকে অভিযোগের ভিত্তিতে দোষী সাব্যস্ত না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নথিপত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য সামনে আনা প্রয়োজন।