স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জ্বালানিসহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে কানাডার প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান
টাচ নিউজ:স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জ্বালানি, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তাসহ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে সহযোগিতা বাড়াতে কানাডার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার, অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত অংশীদারত্বের নতুন সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি। সোমবার (১২ অক্টোবর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাইয়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এ তথ্য জানান। সাক্ষাৎকালে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান, জ্বালানি নিরাপত্তা, কারিগরি শিক্ষা, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু অর্থায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনসহ দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় উঠে আসে। বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর মধ্যে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার দীর্ঘদিনের অবস্থান দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হচ্ছে তাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। এ সময় কানাডার প্রতিমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের গুরুত্বের বিষয়ে একমত পোষণ করেন।
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেছে কানাডা। বিশেষ করে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের ক্ষেত্রে দেশটি বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় অংশীদার হতে পারে বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও এ প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হয়। এ ছাড়া কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করে কানাডা। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার পাশাপাশি নার্সিং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও দক্ষ নার্স তৈরির ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে জানানো হয়, নার্সিং খাতে কানাডার বিদ্যমান কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে দক্ষ জনবল তৈরিতে এ সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। বিশেষ করে ডাল ও তৈলবীজের মতো কৃষিপণ্যের উৎপাদন এবং সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়। বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টায় সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করে কানাডার প্রতিনিধিদল। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম উন্নয়ন কেন্দ্রের মাধ্যমে পরিচালিত বিদ্যমান কার্যক্রম সম্পর্কেও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করা হয়। বৈঠকে সরকারের কৃষক কার্ড কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হয়। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের কাছে সার, বীজসহ প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর ফলে কৃষকদের বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে কৃষি খাতে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সরকারি সহায়তা আরও কার্যকরভাবে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া যাবে। তথ্য ব্যবস্থাপনা ও উপাত্তভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়নে কানাডার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ সহযোগিতা পেতে পারে বলেও বৈঠকে আলোচনা হয়।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি আরও কার্যকর করা এবং দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের পরিকল্পনাও বৈঠকে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশ্বব্যাংকের তথ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, একাধিক খাদ্য ভর্তুকি কর্মসূচি একত্র করা এবং বিদ্যমান নগদ সহায়তা কর্মসূচিগুলোর লক্ষ্য নির্ধারণ আরও কার্যকর করার পাশাপাশি এর সঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যুক্ত করা গেলে দেশের অতিরিক্ত ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর সরকার সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির পাশাপাশি মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়িয়ে তাদের স্বনির্ভর করে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বৈঠকে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, খাল খনন ও ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মতো উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। জবাবে কানাডার প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু অর্থায়নে ১ হাজার ৩০০ কোটি কানাডীয় ডলার দেবে তাঁর দেশ। এ অর্থায়ন থেকে বাংলাদেশ উপকৃত হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বা ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করতে আগ্রহ প্রকাশ করে কানাডার প্রতিনিধিদল। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও পরিকল্পনা প্রণয়নে এ ধরনের সহযোগিতা উন্নয়ন উদ্যোগগুলোকে আরও কার্যকর করতে সহায়ক হতে পারে।
বৈঠকে কানাডায় বসবাসরত বাংলাদেশি এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডীয়দের অবদান ও কর্মদক্ষতার প্রশংসা করেন প্রতিমন্ত্রী রণদীপ সরাই। তাঁদের উদ্যোগ, কর্মদক্ষতা ও ইতিবাচক মানসিকতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, কানাডার সংসদে দুই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। সাক্ষাতের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে কানাডা সফরের আমন্ত্রণ জানান দেশটির আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। কানাডার পক্ষে ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির হাইকমিশনার অজিত সিংসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। দুই দেশের আলোচনায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জ্বালানি, কৃষি, জলবায়ু অর্থায়ন ও সামাজিক সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত উঠে আসায় বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।











