ঢাকা | অক্টোবর ১২, ২০২৬ - ৫:৫২ অপরাহ্ন

শিরোনাম

সৌরবিদ্যুতে প্রতি ইউনিটে সাশ্রয় ৫–৬ টাকা, কমবে জ্বালানি আমদানির চাপ

  • আপডেট: Monday, October 12, 2026 - 11:48 am
  • পঠিত হয়েছে: 4 বার
টাচ নিউজ:নিজস্ব অর্থায়নে বা উপযুক্ত অর্থায়ন সুবিধার মাধ্যমে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা গেলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে প্রায় ৫ থেকে ৬ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় সম্ভব। এতে বাসাবাড়ি ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ বিল কমার পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ এবং জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষা ও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে সৌরবিদ্যুৎ। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। তবে এ খাতে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জনে প্রাথমিক বিনিয়োগের ব্যয় কমানো, সহজ শর্তে ঋণ এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১ হাজার ৮৭১ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ৫৭৮ দশমিক ৪১৫ মেগাওয়াট। এ সক্ষমতার মধ্যে গ্রিড-সংযুক্ত ব্যবস্থায় ১ হাজার ২০০ দশমিক ৯৪ মেগাওয়াট এবং গ্রিডের বাইরে ৩৭৭ দশমিক ৪৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বাসসকে বলেন, ব্যক্তি পর্যায়ে প্রয়োজন অনুযায়ী সৌর প্যানেল স্থাপন করা হলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে অন্তত ৫ থেকে ৬ টাকা সাশ্রয় করা সম্ভব। এতে সরকারের কোষাগারের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী পরিবার ও প্রতিষ্ঠানও আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারে। তিনি জানান, দিনের বেলায় গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য শিল্পকারখানাগুলোকে সাধারণত প্রতি ইউনিট বা কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ১১ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে ১৬ টাকা ৬ পয়সা পর্যন্ত পরিশোধ করতে হয়। অন্যদিকে, ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৫ থেকে ৬ টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ রয়েছে।

শফিকুল আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাদে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ প্রায় ৪ থেকে ৫ টাকা। আর ভূমিতে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রে এ ব্যয় প্রতি ইউনিটে ৮ থেকে ৯ টাকা হতে পারে। সরকার জমি, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুবিধা দিলে সৌরবিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় প্রতি ইউনিটে আনুমানিক ৬ টাকা ৫০ পয়সায় নামিয়ে আনা সম্ভব। এসব সুবিধা না থাকলে ব্যয় বেড়ে প্রায় ৯ টাকা হতে পারে বলেও জানান তিনি। জ্বালানি বিশেষজ্ঞের মতে, ছাদে স্থাপিত সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা যায়। ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার প্রয়োজন কমে। তবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের প্রাথমিক ব্যয়, অর্থায়নের ধরন, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে প্রকৃত সাশ্রয়ের পরিমাণ নির্ধারিত হবে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে ব্যয় হয় ১৩ টাকা ১৩ পয়সা। ফার্নেস অয়েল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে এ ব্যয় ২৭ টাকা ৪০ পয়সা। অন্যদিকে, দেশীয় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে ব্যয় আনুমানিক ৭ টাকা ৯ পয়সা। এই ব্যয়ের তুলনায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ অনেক ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হতে পারে। পাশাপাশি দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়লে প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।শেরপুরের নকলা উপজেলার হুজুরীকান্দা গ্রামে অবস্থিত মতি অ্যাগ্রিভোলটাইক প্রকল্পে কৃষি, সেচ ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কার্যক্রমে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রকল্পটির পরিচালক শহিদুল ইসলাম বাসসকে জানান, নিরাপদ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, সেচ এবং কার্যালয়ের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে প্রকল্পটিতে মোট ৩৫ দশমিক ৩ কিলোওয়াট ক্ষমতার দুটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।

এর মধ্যে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের জন্য ২৬ দশমিক ৫ কিলোওয়াট এবং সেচপাম্প ও কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ৮ দশমিক ৮ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে। তিনি জানান, এসব ব্যবস্থায় দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। ফলে প্রকল্পটিতে লোডশেডিংয়ের সমস্যা হয় না বলে তাঁর দাবি। শহিদুল ইসলাম বলেন, সৌর প্যানেল স্থাপনে মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। ব্যবস্থাটির আনুমানিক আয়ুষ্কাল ২৫ বছর। রক্ষণাবেক্ষণ ও খুচরা যন্ত্রাংশের ব্যয় বাদে তাঁদের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ প্রায় সাড়ে ৩ টাকা। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারত ও পাকিস্তানে এ ব্যয় প্রতি ইউনিটে সাড়ে ৩ থেকে ৪ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে, একটি সমীক্ষার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রায় নয় ঘণ্টার বিদ্যুৎ ব্যবহারের সমপরিমাণ সংরক্ষণক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করা গেলে ২০ বছরে প্রতি ইউনিটের আনুমানিক ব্যয় ৭ টাকা ৪৩ পয়সায় নামিয়ে আনা সম্ভব। সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ব্যয় কমানো এবং এর প্রসার বাড়াতে সরকার সম্প্রতি নির্দিষ্ট কিছু সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক কমিয়ে ১ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। এ সুবিধা ১৮০ দিনের জন্য কার্যকর থাকবে। এ ছাড়া ছাদে ব্যাটারিসহ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনে উৎসাহ দিতে প্রণোদনার ব্যবস্থাও চালু করেছে সরকার। এ ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা দেওয়ার কথা রয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কমানো, জ্বালানি আমদানির চাপ হ্রাস এবং পরিবেশদূষণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। কোস্টাল লাইভলিহুড অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল অ্যাকশন নেটওয়ার্কের (ক্লিন) প্রধান নির্বাহী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ হাসান মেহেদী বলেন, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী পেট্রোলিয়াম সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হতে পারে। হাসান মেহেদী আরও বলেন, পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সরকারের আরও জোরালো উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার প্রসারে সহজ অর্থায়ন, নীতিগত সহায়তা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুতের অন্তত ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের ২০২৬–২০৩০ মেয়াদি জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ভূমিতে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, সরকারের লক্ষ্য অর্জনে ২০২৮ সালের মধ্যে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৯ টাকা ১২ পয়সা দরে ৯১৮ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ১২টি স্বতন্ত্র বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের (আইপিপি) সঙ্গে চুক্তি করেছে বিপিডিবি। তিনি আরও জানান, নিজস্ব অর্থায়নে গ্রিড-সংযুক্ত ৬৮৯ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার বিভিন্ন প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প ২০৩০ সালের মধ্যে চালু হওয়ার কথা রয়েছে। সরকার নতুন বাণিজ্যিক, শিল্প ও সরকারি ভবনে ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের শর্ত বাস্তবায়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে যেসব স্থাপনার বৈদ্যুতিক লোড ১০ কিলোওয়াটের বেশি, সেগুলোর ক্ষেত্রে এ শর্তের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সৌরবিদ্যুতের প্রসারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং শহরের আবাসিক গ্রাহকদের জন্য সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়তে পারে। তবে প্রতি ইউনিটে ৫ থেকে ৬ টাকা সাশ্রয়ের হিসাব মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, অর্থায়ন, ব্যাটারি, রক্ষণাবেক্ষণ ও যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপনের মোট ব্যয় বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কারণ, এসব খরচ এবং বিদ্যুতের ব্যবহারভেদে প্রকৃত সাশ্রয়ের পরিমাণে পার্থক্য হতে পারে।

চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সৌর, বায়ু ও বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোকে জ্বালানি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে, সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় কমানো, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান বাড়তে পারে। এতে একদিকে যেমন জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার হবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জীবাশ্ম জ্বালানির দামের ওঠানামার ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পরিবেশ সুরক্ষায়ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হবে।