দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি ও পরিকল্পিত নগরায়ণের তাগিদ রাষ্ট্রপতির
টাচ নিউজ:যেকোনো ধরনের দুর্যোগে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি, বাস্তবভিত্তিক নগর পরিকল্পনা এবং দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ মোকাবিলায়ও আরও সচেতন হতে হবে। বিশেষ করে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণ বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সোমবার (১৩ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ নিয়েও আমাদের আরও বেশি ভাবতে হবে। ঢাকা শহরের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় ভূমিকম্পের আশঙ্কা বিশেষ উদ্বেগের বিষয়। বিশ্বের বিভিন্ন শহরে অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থার কারণে দুর্যোগে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, বিশেষ করে বাড়িঘর নির্মাণের ক্ষেত্রে যথাযথ নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং নদীদূষণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কাঠমান্ডু ও তেহরানের সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, পরিকল্পিত ব্যবস্থা না থাকলে দুর্যোগে প্রাণহানি অনেক বেড়ে যায়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণের কারণে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। এ কারণে নগর পরিকল্পনা, ভবন নির্মাণের নিরাপত্তা এবং দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসের বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, ভূমিধস, খরা, বজ্রপাত ও ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে আসছে। ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ওই দুর্যোগের ভয়াবহতা এবং মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রতিক্রিয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগের ব্যাপকতা ও এর পরিণতি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। একটি রাষ্ট্রকে দুর্যোগের কারণে কত বড় মূল্য দিতে হতে পারে, ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ এখন বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের দায় অত্যন্ত সামান্য হলেও এর বিরূপ প্রভাবের বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষসহ দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে নানা ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে হচ্ছে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ফলে দুর্যোগে প্রাণহানি অনেক কমেছে। বন্যাসহ বিভিন্ন দুর্যোগে প্রস্তুতি, উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতাও বেড়েছে। তবে শুধু আগাম সতর্কবার্তা প্রদানেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না বলে মন্তব্য করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, আগাম সতর্কীকরণ থেকে আগাম পদক্ষেপ গ্রহণের দিকে যেতে হবে। দুর্যোগ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দুর্যোগের পর দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সক্ষমতাও গড়ে তুলতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবকদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাঁদের বিষয়ে এখনো কোনো আইন প্রণয়ন করা হয়নি। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সুরক্ষা ও কার্যক্রমের জন্য আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি। রাষ্ট্রপতি বলেন, নদীভাঙন, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাবদ্ধতা, অগ্নিকাণ্ড ও ভূমিকম্পসহ নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। এসব ঝুঁকি কমাতে পরিবেশদূষণ রোধ, জলাভূমি ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ, ঝুঁকিসচেতন নগর পরিকল্পনা এবং দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণে আরও দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানির প্রবাহ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করেছিলেন। বর্তমান সরকারও এ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এসব কর্মসূচি আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষের প্রস্তুতির প্রশংসা করে রাষ্ট্রপতি সিলেটের হাওর অঞ্চলের মানুষের আগাম প্রস্তুতির কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের উদ্যোগেরও প্রশংসা করেন তিনি। দুর্যোগ প্রস্তুতিতে সাধারণ মানুষের দায়িত্বের কথা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, নিজেদের ঘরবাড়ি নিরাপদ করার পাশাপাশি পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদেরও প্রস্তুতির আওতায় আনতে হবে। জরুরি কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিরাপদে রাখতে হবে এবং সরকারের আগাম সতর্কবার্তায় দ্রুত সাড়া দিতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, নদী-খাল রক্ষা এবং বৃক্ষরোপণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি বলেন, বৃক্ষরোপণ অত্যন্ত জরুরি। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার প্রায় ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এ উদ্যোগ দুর্যোগ মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। সম্মিলিতভাবে দুর্যোগসহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সহনশীলতার সূচনা হোক ঘর থেকে। আসুন, ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে চলি এবং দুর্যোগসহনশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলি।’ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুন্সী রফিকুল আলম। এর আগে সকাল ১০টার দিকে রাষ্ট্রপতি অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস উপলক্ষে স্থাপিত বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন। পরে বক্তব্য দেওয়ার আগে তিনি ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির শ্রেষ্ঠ স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রেজওয়ানুর রহমান। অনুষ্ঠানের শুরুতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রশমন বিষয়ে নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।











