ঢাকা | সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬ - ৫:৩০ অপরাহ্ন

শিরোনাম

ব্যক্তিস্বার্থের রিট বন্ধ হলে কমবে হাইকোর্টের মামলার চাপ: অ্যাটর্নি জেনারেল

  • আপডেট: Saturday, September 19, 2026 - 10:48 am
  • পঠিত হয়েছে: 5 বার

টাচ নিউজ:সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে চলতি বছরে নতুন রিট মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে নতুন রিটের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে এবং ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়গুলোতে সরাসরি রিট করার প্রবণতা বন্ধ হলে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার চাপ আরও কমে আসতে পারে। অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল মনে করেন, আদালতে বিচারিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা গেলে প্রকৃত অর্থেই মানুষ ন্যায়বিচার পাবেন এবং অপ্রয়োজনীয় রিট মামলার সংখ্যাও কমবে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে দেওয়া এক বক্তব্যে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বর্তমান প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আদালতে শৃঙ্খলা আনার চেষ্টা করছেন। বিচারিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা গেলে রিট মামলার সংখ্যা কমে আসবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দ্বিতীয় প্রান্তিকে নিষ্পত্তি দ্বিগুণের বেশি:

সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলামের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৬০টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিন মাসে হাইকোর্টে নতুন রিট মামলা দায়ের হয় ৪ হাজার ১১২টি। একই সময়ে নিষ্পত্তি হয় ২ হাজার ২১৩টি রিট মামলা। তবে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দ্বিতীয় প্রান্তিকে রিট মামলা নিষ্পত্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত হাইকোর্টে নতুন রিট মামলা দায়ের হয় ৪ হাজার ৭২৯টি। বিপরীতে এই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে ৯ হাজার ৫৯০টি রিট মামলা। অর্থাৎ দ্বিতীয় প্রান্তিকে নতুন রিট মামলা দায়েরের তুলনায় নিষ্পত্তির সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি ছিল। এর ফলে জুনের শেষে হাইকোর্টে বিচারাধীন রিট মামলার সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ২৪ হাজার ৯৯৯টিতে। তিন মাসে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কমেছে ২ হাজার ৯৬১টি।

ব্যক্তিস্বার্থে রিট নিয়ে প্রশ্ন:

হাইকোর্টে এখনও লক্ষাধিক রিট মামলা বিচারাধীন থাকার বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, অনেক ক্ষেত্রে জনস্বার্থে মামলা বা পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশনের (পিআইএল) নামে ব্যক্তিস্বার্থে রিট করা হচ্ছে। তার মতে, কিছু ক্ষেত্রে এসব রিটের উদ্দেশ্য জনস্বার্থ রক্ষা নয়, বরং আত্মপ্রচার। রিট মামলা করার পরপরই গণমাধ্যমের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাকেও তিনি অনাকাঙ্ক্ষিত বলে উল্লেখ করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, প্রকৃত জনস্বার্থের বিষয়গুলোতে রিটের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থ বা ব্যক্তিগত বিরোধকে জনস্বার্থের মামলা হিসেবে উপস্থাপন করে হাইকোর্টে নিয়ে আসার প্রবণতা বিচারব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

আপিল বিভাগের রায় মানা বাধ্যতামূলক:

বিচারিক শৃঙ্খলার প্রসঙ্গে সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদের কথা তুলে ধরেন অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনি বলেন, সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায় হাইকোর্টের জন্য বাধ্যতামূলক। অনেক বিষয়ে আপিল বিভাগ ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন—কোন ধরনের মামলা হাইকোর্ট গ্রহণ করতে পারবেন এবং কোনগুলো গ্রহণ করতে পারবেন না। তারপরও এসব বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন হাইকোর্ট বেঞ্চে মামলা গ্রহণ ও আদেশ দেওয়ার কারণে বিচারিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। প্রাইভেট ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিটের উদাহরণ দিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সুপ্রিম কোর্টের অসংখ্য রায়ে বলা হয়েছে যে প্রাইভেট ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট পিটিশন চলে না। তারপরও সময়ে সময়ে বিভিন্ন হাইকোর্ট বেঞ্চে প্রাইভেট ব্যাংকের বিরুদ্ধে রিট গ্রহণ করে আদেশ দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, এ ধরনের জায়গাগুলোতে বিচারিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে হাইকোর্টে রিট মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

ব্যক্তিগত বিরোধেও সরাসরি রিট:

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয়েও সরাসরি হাইকোর্টে রিট করার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। জমি দখল, জমির সীমানা নির্ধারণ, বিল-বাঁওড়সহ বিভিন্ন ব্যক্তিগত বিরোধের বিষয় সরাসরি রিটের মাধ্যমে হাইকোর্টে নিয়ে আসা হচ্ছে বলে জানান তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত বিরোধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিম্ন আদালতে গিয়ে মামলা করে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অনেকে সরাসরি হাইকোর্টে রিটের মাধ্যমে প্রতিকার চাইছেন। এতে হাইকোর্টে রিট মামলার সংখ্যা বাড়ছে এবং বিচারিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন অ্যাটর্নি জেনারেল।

সংবিধানে পাঁচ ধরনের রিটের সুযোগ:

বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রিট করার সুযোগ রয়েছে। প্রচলিতভাবে রিটের পাঁচটি ধরন রয়েছে। হেবিয়াস করপাস: কোনো ব্যক্তিকে আইনগত কারণ ছাড়া আটক রাখা হলে তাকে আদালতের সামনে হাজির করার নির্দেশ চেয়ে এ ধরনের রিট করা যায়। ম্যান্ডামাস: কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠান আইন অনুযায়ী যে দায়িত্ব পালনে বাধ্য, তা পালন না করলে সেই দায়িত্ব পালনের নির্দেশ চেয়ে ম্যান্ডামাস রিট করা হয়। সার্টিওরারি: কোনো নিম্ন আদালত বা ট্রাইব্যুনাল আইনবহির্ভূতভাবে কোনো আদেশ দিলে তা বাতিলের জন্য এ ধরনের রিট করা যায়। প্রহিবিশন: কোনো বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনাল তার আইনগত ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করে কোনো মামলা বা কার্যক্রম পরিচালনা করলে তা বন্ধ করার নির্দেশ চেয়ে এ রিট করা হয়। কো-ওয়ারেন্টো: কোনো ব্যক্তি আইনগত যোগ্যতা বা বৈধ কর্তৃত্ব ছাড়া কোনো সরকারি পদে দায়িত্ব পালন করলে তার ওই পদে থাকার বৈধতা যাচাইয়ের জন্য এ ধরনের রিট করা হয়।

জনস্বার্থে রিটের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা:

বাংলাদেশে জনস্বার্থে রিটের আইনগত ভিত্তি গড়ে ওঠে ‘মহিউদ্দিন ফারুক বনাম বাংলাদেশ’ মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে। ঐতিহাসিক ওই রায়ে জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর কোনো ঘটনায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আইনি প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট করার সুযোগ পায়। এরপর দেশে জনস্বার্থে রিট মামলা একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। গত কয়েক দশকে হাইকোর্টে জনস্বার্থে করা বিভিন্ন রিট মামলার মাধ্যমে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ এসেছে। এর মধ্যে পরিবেশ, নদী, জনস্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য, নারী ও শিশু অধিকার এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয় রয়েছে।

নদীকে জীবন্ত সত্তার স্বীকৃতিতেও রিটের ভূমিকা:

রিট মামলার মাধ্যমে দেশের নদীগুলো ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে হাইকোর্টে করা রিটের রায় বা আদেশের মাধ্যমে নদ-নদী দখলদারদের উচ্ছেদ, অবৈধ ইটভাটা বন্ধ এবং পাহাড় কাটা রোধে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জনস্বাস্থ্য ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের জন্য মানবিক ক্ষতিপূরণ এবং নারী-শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও রিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অনেক ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি জনস্বার্থে রিট করলেও আদালতের রায় বা আদেশের সুফল পেয়েছেন দেশের হাজারো মানুষ।

প্রয়োজন প্রকৃত জনস্বার্থের রিট:

আইনজীবী ও সংশ্লিষ্টদের মতে, জনস্বার্থে রিট নাগরিক অধিকার ও জনস্বার্থ রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ব্যবস্থা। তবে ব্যক্তিগত বিরোধ, জমি-সংক্রান্ত বিষয় বা অন্য কোনো ব্যক্তিস্বার্থের বিষয়কে রিটের মাধ্যমে হাইকোর্টে নিয়ে আসার প্রবণতা কমানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে আপিল বিভাগের বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত অনুসরণ এবং হাইকোর্টে রিট গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্ধারিত আইনি সীমা যথাযথভাবে মেনে চলা গেলে বিচারিক শৃঙ্খলা আরও শক্তিশালী হতে পারে। এতে একদিকে প্রকৃত জনস্বার্থের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে হাইকোর্টে দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন রিট মামলার চাপও ধীরে ধীরে কমে আসতে পারে।