ঢাকা | অক্টোবর ১৭, ২০২৬ - ৫:১৮ অপরাহ্ন

শিরোনাম

খাল খননের মাটি দিয়ে ইট তৈরির পরিকল্পনা, টপসয়েল রক্ষায় উদ্যোগ

  • আপডেট: Saturday, October 17, 2026 - 10:41 am
  • পঠিত হয়েছে: 5 বার

টাচ নিউজ:কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি বা টপসয়েল রক্ষা এবং ফসল উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইটভাটায় কৃষিজমির টপসয়েলের ব্যবহার কমাতে সারাদেশে খাল খননের পর পাওয়া উদ্বৃত্ত মাটি সংগ্রহ করে তা বৈধ ইটভাটায় সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু করে পরে বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে। সরকারের আশা, খাল খননের মাটির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে একদিকে মাটির অপচয় কমবে, অন্যদিকে ইট তৈরির জন্য কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটি কেটে নেওয়ার প্রবণতাও হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে পোড়ানো ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে কৃষিজমির টপসয়েল সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। অপরিকল্পিতভাবে ইটভাটায় কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহারের ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ উর্বর মাটি হারিয়ে যাচ্ছে। এতে জমির উৎপাদনশীলতা কমার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন করে একটি পাইলট প্রজেক্ট নিয়েছি। আশা করি, এ বছর পাইলট প্রজেক্ট শুরু করলেও আগামীতে এটাকে আরও ব্যাপক পরিসরে সম্প্রসারণ করা হবে।’

প্রতিমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের শেষ অথবা নভেম্বরের শুরুতে সারাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হতে পারে। যেসব এলাকায় খাল খনন করা হবে, সেসব এলাকার জেলা প্রশাসকদের বৈধ ইটভাটার মালিকদের এ কর্মসূচির আওতায় আনার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খনন শেষে উদ্বৃত্ত মাটি নির্ধারিত ইটভাটায় সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘টপসয়েল নষ্ট করতে দেব না—এটা সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর সিদ্ধান্ত। আমাদের ফার্টাইল ল্যান্ডকে রক্ষা করতে হলে ইটভাটায় টপসয়েলের ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।’ ইটভাটার মালিক সমিতির নেতাদেরও বিষয়টি জানানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইটভাটাগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি দেশে ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রচলিত ইট উৎপাদনে মাটির ব্যবহার কমবে এবং ইটভাটাগুলো ধীরে ধীরে ব্লক ইট উৎপাদনের দিকে যেতে পারবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টপসয়েল হচ্ছে কৃষিজমির উপরিভাগের পুষ্টিসমৃদ্ধ মাটি। এতে জৈব পদার্থ ও উদ্ভিদের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপাদান থাকে, যা মাটির উর্বরতা বজায় রাখা এবং ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই স্তর সরিয়ে নেওয়া হলে জমির উৎপাদনক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বাসসকে বলেন, টপসয়েলে জৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকে। এ জৈব পদার্থ ও প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান উদ্ভিদের বৃদ্ধি এবং মাটির উর্বরতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। তিনি বলেন, টপসয়েল সরিয়ে নেওয়ার ফলে জমির উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ক্ষতিগ্রস্ত জমিকে আবার উৎপাদন উপযোগী করতে অতিরিক্ত সার ও অন্যান্য উপকরণের প্রয়োজন হতে পারে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়। স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে টপসয়েল রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রায় আট হাজার ইটভাটায় কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি এবং এর নিচের মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, টপসয়েল অপসারণের পর জমির স্বাভাবিক উর্বরতা পুনরুদ্ধারে ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগতে পারে। এতে কৃষি উৎপাদন কমার পাশাপাশি কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকিও তৈরি হয়, যা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। পোড়ানো ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, পোড়ানো ইটের পরিবর্তে ব্লক ইট ব্যবহারে সরকার ২০১৯ ও ২০২৫ সালে পরিপত্র জারি করলেও নানা জটিলতায় তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তার মতে, সরকারি কাজে পোড়ানো ইটের ব্যবহার কমিয়ে ব্লক ইটের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কৃষিজমির টপসয়েল উত্তোলন, মাটির ক্ষয় ও বায়ুদূষণ কমানো সম্ভব হবে। তিনি বলেন, টপসয়েল সংরক্ষণের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা রক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত এবং বায়ুদূষণ কমানোর মতো একাধিক সুফল পাওয়া সম্ভব।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, ইট তৈরির জন্য কৃষিজমির টপসয়েল কেটে নেওয়ার ফলে মাটির প্রয়োজনীয় পুষ্টি নষ্ট হয়। এতে জমির উর্বরতা ও ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে টপসয়েল রক্ষার বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৩ অনুযায়ী, জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া আবাদযোগ্য জমির উপরিভাগের মাটি কাটার ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে আর্থিক লাভের আশায় অনেক কৃষক ইটভাটার মালিকদের কাছে টপসয়েল বিক্রি করেন। এ প্রবণতা বন্ধে আইনের কার্যকর প্রয়োগের পাশাপাশি কৃষকদের সচেতন করা জরুরি। আলমগীর কবির আরও বলেন, সারাদেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচিতে উত্তোলিত মাটি কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। পরিকল্পিতভাবে খননের মাটি কাজে লাগানো গেলে একদিকে অপচয় রোধ হবে, অন্যদিকে ইটভাটায় কৃষিজমির মাটির ব্যবহারও কমতে পারে। সরকারের পরিকল্পনায় খাল খননের মাটিকে বৈধ ইটভাটার বিকল্প কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে এ উদ্যোগ সফল করতে বৈধ ইটভাটার তালিকা প্রণয়ন, মাটির গুণগত মান যাচাই, পরিবহন ও সরবরাহের স্বচ্ছ ব্যবস্থা এবং মাঠপর্যায়ে নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, খাল থেকে উত্তোলিত সব মাটি ইট তৈরির উপযোগী হবে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। পাশাপাশি খাল খননের ফলে পরিবেশ, পানি প্রবাহ ও কৃষিজমির ওপর কী প্রভাব পড়ছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। মাটির ব্যবহার নির্ধারণে পরিবেশগত ও কারিগরি মূল্যায়ন থাকলে প্রকল্পটির সুফল বাড়তে পারে। দেশে কৃষিজমির পরিমাণ সীমিত হলেও জনসংখ্যা ও খাদ্যের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। এ অবস্থায় বিদ্যমান জমির উৎপাদনক্ষমতা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একবার উর্বর উপরিভাগের মাটি সরিয়ে নিলে জমির স্বাভাবিক উৎপাদনক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, খাল খনন, উদ্বৃত্ত মাটির ব্যবস্থাপনা, বৈধ ইটভাটার সঙ্গে সমন্বয় এবং ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। পাইলট প্রকল্পের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে এর পরিধি বাড়ানো হলে কৃষিজমির টপসয়েলের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি খননের মাটির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।