আগামীকাল শুরু শারদীয় দুর্গোৎসব, পাঁচ দিনের ছুটিতে উৎসবের আমেজ
টাচ নিউজ:বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হচ্ছে আগামীকাল শুক্রবার। এদিন মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হবে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা। দেবী দুর্গার বোধনের মধ্য দিয়ে সূচনা হবে পূজার মূল পর্বের। আগামী ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে পাঁচ দিনব্যাপী এ উৎসব। দুর্গাপূজা ঘিরে দেশজুড়ে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলোতে প্রতিমা স্থাপন, প্যান্ডেল নির্মাণ, সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন প্রায় শেষ পর্যায়ে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পূজামণ্ডপগুলোতে এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবার মহাসপ্তমীর তিথি শনিবার ও রোববার বিস্তৃত থাকায় পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে সপ্তমী থেকেই। এদিন নবপত্রিকার পূজা অনুষ্ঠিত হবে। দেবীর বিভিন্ন রূপের প্রতীক হিসেবে নয়টি উদ্ভিদকে স্নান করিয়ে পূজা করার মধ্য দিয়ে এ আচার পালন করা হয়। সোমবার উদযাপিত হবে মহাষ্টমী। এদিনের অন্যতম আকর্ষণ সন্ধিপূজা, যা অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন মহানবমীতে পূজার গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে এবং দেবীকে ভোগ নিবেদন করা হবে। বিজয়া দশমীতে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানিয়ে শোভাযাত্রার মাধ্যমে প্রতিমা নির্ধারিত নদী, পুকুর বা জলাশয়ে বিসর্জন দেওয়া হবে। পঞ্জিকা অনুযায়ী, এবার জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা ঘোড়ায় চড়ে স্বর্গলোক থেকে মর্ত্যে আগমন করবেন। অন্যদিকে, নৌকায় চড়ে তিনি স্বর্গলোকে গমন করবেন। গত ১০ অক্টোবর হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মহালয়া উদযাপন করেন। মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকেই পূজামণ্ডপগুলোতে প্রস্তুতির গতি বাড়তে থাকে। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা ভক্তদের বাধাবিঘ্ন, ভয়, দুঃখ, শোক ও যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করেন। ধর্মীয় আখ্যান অনুসারে, ত্রেতা যুগে রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ এবং সীতা উদ্ধারের লক্ষ্যে রাজা রামচন্দ্র শরৎকালে দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়ার পূজা করেছিলেন। সেই বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় শরৎকালে দুর্গোৎসব পালিত হয়ে আসছে।
হিন্দু সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার নির্বাহী আদেশে এ বছর দুর্গাপূজার ছুটি তিন দিন পর্যন্ত বাড়িয়েছে। শুক্রবার ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে বর্ধিত ছুটি যুক্ত হওয়ায় ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত টানা পাঁচ দিনের ছুটি পাওয়া যাবে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর বাসসকে বলেন, ‘এটি সত্যিই একটি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত। এমন সিদ্ধান্তের জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাই।’ এদিকে দুর্গাপূজা উপলক্ষে পূজামণ্ডপের সরকারি অনুদান ৪ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫০০টি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৮৫১টিতে। রাজধানীতে দুর্গাপূজার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির। সেখানে পূজার পাশাপাশি ভক্তিমূলক সংগীতানুষ্ঠান, বস্ত্র বিতরণ, মহাপ্রসাদ বিতরণ, আরতি প্রতিযোগিতা ও বিজয়া শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রাঙ্গণে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির উদ্যোগে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ খোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। এ ছাড়া রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশন, তাঁতীবাজার, শাঁখারী বাজারসহ রাজধানীর বিভিন্ন মন্দিরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। দেশের বিভিন্ন পূজামণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণ ও স্থাপন, প্যান্ডেল সাজানো এবং বর্ণিল আলোকসজ্জার কাজ প্রায় শেষ। উৎসবকে আনন্দমুখর করে তুলতে আয়োজকেরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আয়োজনও প্রস্তুত করছেন।
দুর্গোৎসব নির্বিঘ্ন করতে রাজধানীসহ সারাদেশের পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। পুলিশ, আনসার, বিজিবি, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। পাশাপাশি অনেক মণ্ডপে নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দল নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পূজামণ্ডপগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আশঙ্কায় আয়োজকদের জেনারেটর প্রস্তুত রাখা এবং বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে রিচার্জেবল লাইট বা বাতি রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির নেতারা হিন্দু সম্প্রদায়সহ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সব নাগরিককে শারদীয় দুর্গাপূজার শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি দুর্গাপূজা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উৎসবকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণ, পারস্পরিক শুভেচ্ছা ও সৌহার্দ্য দেশের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্যকে আরও উজ্জ্বল করে তুলবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।











