গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পকারখানায় বেহাল দশা, কমেছে উৎপাদন
টাচ নিউজ: প্রয়োজনীয় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ না পাওয়ায় দেশের শিল্পকারখানাগুলোতে নেমে এসেছে চরম অস্থিরতা। জ্বালানি সংকটে স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক কারখানায় উৎপাদন ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন নেমে এসেছে সক্ষমতার অর্ধেকেরও নিচে। এতে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, তৈরি হচ্ছে লোকসানের চাপ এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় রপ্তানি আদেশ ও বাজার হারানোর আশঙ্কায় পড়েছেন উদ্যোক্তারা। শিল্প মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট সামাল দিতে অনেক কারখানায় স্বাভাবিক কর্মঘণ্টার বাইরে অতিরিক্ত সময় উৎপাদন চালাতে হচ্ছে। এতে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা বাড়লেও বাড়ছে না উৎপাদন সক্ষমতা। বিদ্যুৎ না থাকায় দিনের বড় একটি সময় মেশিন বন্ধ থাকছে। পরে উৎপাদনের ঘাটতি পূরণ করতে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে শ্রমিকদের।
গ্যাসের চাপ কম, বন্ধ ডাইং ইউনিট:
গ্যাসনির্ভর ডাইং, নিটিং ও টেক্সটাইল কারখানাগুলোতে সংকট সবচেয়ে বেশি। গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রায় না থাকায় অনেক কারখানা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে কেমিক্যাল মিশ্রিত কাপড় নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গাজীপুরের সাদামা ফ্যাশনওয়্যারের মহাব্যবস্থাপক মঈনুল ইসলাম জানান, কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ এক পিএসআইয়ের নিচে থাকায় ডাইং ইউনিট চালানো সম্ভব হচ্ছে না। তৈরি পোশাকের জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় সাধারণত নির্ধারিত সময়ের আগেই ডাইং করতে হয়। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে এক সপ্তাহ ধরে তাদের ডাইং ইউনিট কার্যত বন্ধ রয়েছে। তার ভাষ্য, গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে ক্রয়াদেশ স্থগিত বা বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ডিজেলে বাড়তি কোটি কোটি টাকা ব্যয়:
গ্যাস ও বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে অনেক কারখানাকে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। উদ্যোক্তাদের দাবি, কোনো কোনো কারখানায় প্রতি মাসে অতিরিক্ত কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত ডিজেল কিনতে হচ্ছে। ভবানীপুরের মোশাররফ কম্পোজিট টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোশাররফ হোসেন বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে তাদের কারখানায় সুতা উৎপাদনের অধিকাংশ মেশিন বন্ধ রয়েছে। কয়েক দিন ধরে সক্ষমতার মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে। তার মতে, এত কম উৎপাদন দিয়ে শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকের কিস্তি ও অন্যান্য খরচ বহন করে দীর্ঘদিন কারখানা চালু রাখা সম্ভব নয়।
গাজীপুর-সাভার-নরসিংদীতে সংকট তীব্র:
শিল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, গাজীপুরে ছোট-বড় পাঁচ হাজারের বেশি শিল্পকারখানা রয়েছে। সাভার ও আশুলিয়ায় রয়েছে আরও কয়েক হাজার কারখানা। নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ ও অন্যান্য শিল্পাঞ্চলেও বিপুলসংখ্যক গ্যাসনির্ভর কারখানা রয়েছে। এসব কারখানার মধ্যে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, খাদ্যপণ্য, ওষুধ, সিরামিক, ইস্পাতসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে সীমিত আকারে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করছেন। নরসিংদীর শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, সদর, মাধবদী, চৌয়ালা ও আশপাশের শিল্প এলাকায় গ্যাসনির্ভর বহু কারখানা উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বা বন্ধ রেখেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বয়লার চালাতে কাঠ ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন সচল রাখা গেলেও ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।
১২-১৩ ঘণ্টা কাজেও পূরণ হচ্ছে না উৎপাদন ঘাটতি:
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে স্বাভাবিক কর্মঘণ্টার চেয়ে বেশি সময় কারখানায় থাকতে হচ্ছে শ্রমিকদের। দিনের বড় একটি সময় বিদ্যুৎ বা গ্যাস না থাকায় উৎপাদন বন্ধ থাকে। পরে সেই ঘাটতি পূরণ করতে অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, স্বাভাবিক সময়ে কারখানাগুলোতে ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ হলেও সংকটের কারণে এখন ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, উৎপাদন স্বাভাবিক না হলে সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করা কঠিন হবে। ফলে ক্রয়াদেশ বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
চাকরি হারানোর আতঙ্ক শ্রমিকদের মধ্যে:
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট শুধু শিল্প উৎপাদনেই নয়, শ্রমিকদের কর্মসংস্থানেও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। দীর্ঘ সময় কারখানা বন্ধ থাকলে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা বাড়ছে। এক পোশাকশ্রমিক জানান, দিনের অনেক সময় বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদন বন্ধ থাকে। পরে নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। চাকরি হারানোর ভয়ে শ্রমিকরা অনেক সময় বাড়তি কাজের বিরুদ্ধেও কথা বলতে পারছেন না।
শিল্পের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কা:
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাস সংকট শিল্পের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডাইং, নিটিং ও ফিনিশিংসহ গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তার দাবি, অনেক কারখানা সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম উৎপাদন করছে। কোথাও কোথাও পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকের বেতন, ব্যাংকঋণের কিস্তি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য ব্যয় চালিয়ে যেতে হচ্ছে। তিনি বলেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে অনেক প্রতিষ্ঠান শ্রমিক ধরে রাখার সক্ষমতা হারাতে পারে। এতে কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার পাশাপাশি কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
গ্যাস সংকটে কমছে বিদ্যুৎ উৎপাদন:
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। দেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসনির্ভর হওয়ায় গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও কমে যায়। আবার বিদ্যুৎ না থাকলে শিল্পকারখানাগুলোকে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যানুযায়ী, দেশে ৫২টি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১১ হাজার ৯৩৪ মেগাওয়াট। গ্যাসের অভাবে এর মধ্যে ২১টি কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ এবং আরও আটটি আংশিকভাবে চালু রয়েছে। পিডিবির হিসাবে, এসব কেন্দ্র পুরোপুরি সচল করা গেলে জাতীয় গ্রিডে আরও ৬ হাজার ৩১২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ অনেক কম:
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ স্বাভাবিক সময়েও কম থাকে। সংকটের সময়ে সরবরাহ আরও কমে যাওয়ায় শিল্প, বিদ্যুৎ, সার, সিএনজি ও আবাসিক খাতে গ্যাস বণ্টনে চাপ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে শিল্পকারখানায় গ্যাসের সরবরাহ কমছে। এতে একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে দেশের শিল্পখাত আরও বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়বে।









