শেখ হাসিনা-কাদেরসহ ১১ দণ্ডিতের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিক্রিতে আজই চিঠি: চিফ প্রসিকিউটর
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত পলাতক আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ ১১ থেকে ১২ জনের সম্পত্তি শনাক্ত করে তা বিক্রির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আজই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাবে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে পাওয়া অর্থ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে বিতরণের প্রস্তাবও দেওয়া হবে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, আদালতের আদেশে বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তির ৫০ শতাংশ শনাক্ত করে সরকার নিলাম বা অন্য কোনো আইনগত প্রক্রিয়ায় বিক্রি করতে পারে। বিক্রয়লব্ধ অর্থ জুলাই শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে বিতরণের জন্য জুলাই ফাউন্ডেশন অথবা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হবে। চিফ প্রসিকিউটর জানান, ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের পর গত এক বছরে দুটি ট্রাইব্যুনাল থেকে আটটি মামলার রায় দেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ প্রায় ৭২ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড হয়েছে।
তিনি বলেন, যেসব আসামি গ্রেপ্তার হয়েছেন বা কারাগারে রয়েছেন, তাদের কেউ কেউ আইন অনুযায়ী আপিল করেছেন। আপিল নিষ্পত্তির পর তাদের ক্ষেত্রে রায় বাস্তবায়নের বিষয়টি নির্ধারিত হবে। তবে পলাতক যেসব আসামি রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করেননি, তাদের আপিলের নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হয়েছে বলে প্রসিকিউশন মনে করছে। ফলে তাদের গ্রেপ্তারের পর রায় কার্যকরে আইনগত বাধা থাকার কথা নয়। পলাতক আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ রয়েছে উল্লেখ করে আমিনুল ইসলাম বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল না করায় এসব সম্পত্তি হস্তান্তর বা বিক্রি করে দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে দ্রুত সম্পত্তিগুলো সরকারের হেফাজতে নেওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ট্রাইব্যুনালের রায় ও আদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে রায় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশনের দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সরকারকে জানানো প্রয়োজন। এ কারণে আজই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি শনাক্ত করে সরকারের হেফাজতে নেওয়া এবং রায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বিক্রি করে অর্থ শহীদ পরিবারগুলোর মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা করতে বলা হবে।
বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির পরিমাণ ও আর্থিক মূল্য সম্পর্কে জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এখনই সম্পত্তির পরিমাণ বা মূল্য নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। সম্পত্তিগুলো স্থাবর না অস্থাবর এবং সেগুলোর প্রকৃত মূল্য কত, তা শনাক্ত ও মূল্যায়নের পর জানা যাবে। এ কাজ সরকার করবে। ট্রাইব্যুনালের রায় ও আদেশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। তিনি জানান, যাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ রয়েছে, তাদের মধ্যে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদের, হাসানুল হক ইনু ও মাহবুবুল আলম হানিফ রয়েছেন। এ ছাড়া আরও কয়েকজনের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ রয়েছে। সব আদেশ যাচাই-বাছাই করে প্রায় ১১ থেকে ১২ জনের সম্পত্তি বিক্রি ও অর্থ বিতরণের বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে। অন্য কোনো আসামির আপিলের মাধ্যমে শেখ হাসিনাসহ পলাতক অন্য আসামিদের আপিলের সুযোগ তৈরি হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, একজন আসামির আপিলের মাধ্যমে অন্য আসামির আপিলের বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে না। শেখ হাসিনার পক্ষে কোনো আপিল করা হয়নি। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে কোনো আসামি আপিল না করলে অনির্দিষ্টকাল তার অপেক্ষায় আদালতের আদেশ ঝুলে থাকতে পারে না। তাই রায় বাস্তবায়নে আইনগত বাধা নেই বলে মনে করছে প্রসিকিউশন।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিক্রির আইনি ভিত্তি সম্পর্কে তিনি বলেন, ট্রাইব্যুনালের নিজস্ব বিধিমালায় এ বিষয়ে বিস্তারিত বিধান না থাকলেও পাবলিক ডিমান্ডস রিকভারি অ্যাক্ট এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারার আওতায় রায় বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনগত বাধা নেই। এ বিষয়ে আলাদা বিধিমালা প্রণয়ন করা গেলে আরও ভালো হবে। তবে বিদ্যমান আইনেই রায় বাস্তবায়ন সম্ভব। তিনি আরও বলেন, রোম স্ট্যাটিউটে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিধান রয়েছে। প্রথম দিকের কয়েকটি রায়ে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও আইন ও বিধি অনুসরণ করে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হবে। সংবাদ সম্মেলনে এক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ এবং তার ইতালি চলে যাওয়া নিয়েও প্রশ্ন করা হয়। জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ওই প্রসিকিউটরকে প্রথমে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং পরে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তিনি যোগদানের এক মাসের মধ্যেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে তার বিদেশযাত্রার ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় তিনি কোথায় যাবেন, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কিছু করার ছিল না।
ঘুষ চাওয়ার অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা রয়েছে উল্লেখ করে আমিনুল ইসলাম বলেন, ঘুষ চাওয়া ও দেওয়া—দুটিই অপরাধ। যারা ঘুষ দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন, তারাও সমানভাবে দায়ী। অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রাথমিকভাবে অভিযোগ স্বীকার করেছিলেন। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অভিযোগ খতিয়ে দেখতে গঠিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদন এখনো পাওয়া যায়নি।











