ঢাকা | অক্টোবর ১৮, ২০২৬ - ১:৩০ অপরাহ্ন

শিরোনাম

প্রকৌশলী এনামুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের পাহাড়

  • আপডেট: Sunday, October 18, 2026 - 6:58 am
  • পঠিত হয়েছে: 5 বার

নিজস্ব প্রতিবেদক:

আওয়ামী সরকারের আমলে গত ১৬ বছর ঘুরেফিরে গণপূর্তের মিরপুর ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ এনামুল হক। গোপালগঞ্জে বাড়ী হওয়ার সুবাদে ওই সময় গণপূর্ত অধিদপ্তরে ব্যাপক প্রভাব খাটাতেন তিনি। যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ক্যাসিনোকান্ডের অন্যতম হোতা ঠিকাদার জি কে শামীম ও কুখ্যাত সন্ত্রাসী বিকাশের সাথে গড়ে তোলেন ঠিকাদারীর শক্ত সিন্ডিকেট। মিরপুরে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য নির্মিত আবাসিক ভবনের হাজার কোটি টাকার নির্মাণ প্রকল্প থেকে টেন্ডার ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে এবং ভুয়া বিল ভাউচার দেখিয়ে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ওই সমস্ত অবৈধ অর্থ দিয়ে গড়ে তুলেছেন আলিশান বাড়ী, ফ্লাট ও প্লট। সরকার পরিবর্তন হলেও উর্ধ্বতন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের আর্থিক সুবিধা দিয়ে কৌশলে বাগিয়ে নিয়েছেন পদোন্নতি। তিনি এখনো রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। গোয়েন্দা সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, যশোর পলিটেকনিক থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পাশ করা শেখ এনামুল গণপূর্ত অধিদপ্তরে চাকুরি পাওয়ার পর মিরপুর ডিভিশনে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত উপসহকারী প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন। এরপর প্রাক্কলনিক সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পেলেও ২০২৫ সাল পর্যন্ত মিরপুর ডিভিশনেই থেকে যান আওয়ামী পরিবারে বেড়ে উঠা শেখ এনামুল। দীর্ঘ এক যুগ ঘুরে ফিরে একই ডিভিশনে কর্মরত থাকার সুযোগ নিয়ে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ক্যাসিনোকাণ্ডের হোতা ঠিকাদার জি কে শামীম এবং কুখ্যাত সন্ত্রাসী বিকাশের সাথে ঠিকাদারীর একটি শক্ত সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন তিনি। ওই সময় সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন প্রকল্পের দশ হাজার কোটি টাকার দরপত্র আহবানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। এসময় বিকাশ বাহিনী, জি কে শামীম ও নিখিল বাহিনী টেন্ডার বাণিজ্যের মহাউৎসব গড়ে তোলেন এবং তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী ও আওয়ামী সরকারের অন্যতম দোসর মোঃ হেলাল উদ্দিন তাকে দিয়ে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। মিরপুর পাইকপাড়ার আবাসন প্রকল্পের ১ হাজার ৮৮ কোটি টাকার ওই প্রকেল্পর কাজ চারবার মেয়াদ বাড়িয়েও শেষ করতে পারেনি ঠিকাদাররা। আরো অন্তত ১৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করতে হবে বলে সূত্র জানিয়েছে। এরমধ্যে গত ২ অক্টোবর ভোরে পাইকপাড়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী আবাসনের (কোয়ার্টার) ১ নম্বর ভবনের লিফট ছিঁড়ে পড়ে শিশুসহ ৩ জন আহত হন। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, লিফটটি দীর্ঘদিন ধরেই ত্রুটিপূর্ণ ছিল এবং সামান্য মেরামত করে বারবার চালু করা হয়েছিল। এ ঘটনার তদন্তে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, ওই ভবন যখন নির্মাণ করা হয় এসব রক্ষণাবেক্ষণের তদারকিসহ নানা বিষয়ে দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন শেখ এনামুলসহ আরো কয়েক কর্মকর্তা। মানহীন লিফট ক্রয় এবং কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে এবং নির্মাণ প্রকল্পের সাথে জড়িত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের গাফিলতির বিষয়টি উঠে এসেছে। গণপূর্তের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগের আমলে শেখ এনামুল হক গোপালগঞ্জের দাপট দেখিয়েছে। বিকাশ, জি কে শামীম ও নিখিলের সাথে মিলেমিশে টেন্ডার বাণিজ্য করে কমিশন নিয়েছে। কাজ শেষ না করেই তার সহযোগিতায় ভুয়া বিল ভাউচার দেখিয়ে পুরো টাকা ঠিকাদাররা উত্তোলন করেছেন। আর এ কাজে কমিশনের বিনিময়ে সহযোগিতা করেছে এনামুল। আরেক কর্মকর্তা বলেন, চাকরীজীবনের গত এক যুগই ঘুরেফিরে মিরপুর ডিভিশনেই কাটিয়েছে শেখ এনামুল। এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলে দুই হাত দিয়ে কামিয়ে নিয়েছে সে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রদের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ বিদায় নিলেও এনামুল রয়ে গেছে। সচিব স্যার বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করলেও বরগুনায় যেতে গড়িমসি করে সে। শুনেছি, বরগুনায় গিয়েও কমিশন বাণিজ্য করেছে এবং কাজ সম্পন্ন না করলেও ৫ পার্সেণ্ট কমিশনের বিনিময়ে বিল ভাউচারে স্বাক্ষর করে অর্থছাড় দিয়েছে। শেখ মোহাম্মদ এনামুল হক চাকুরী জীবনের শুরুতেই উপ-সহকারী প্রকৌশলী থেকে মিরপুরে একাধিক প্লট ও মোহাম্মদপুরে জাতীয় গৃহায়ণ থেকে ফ্ল্যাট বাগিয়ে নিয়েছেন। এনামুল হকের গোপালগঞ্জে আলিশান বাড়ি ও অন্তত বিশ একর জমি রয়েছে এবং নামে বেনামে ব্যাংকে এবং নগদসহ অন্তত ২০ কোটি টাকা রয়েছে একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেছেন। যদিও তার আয়কর নথিতে কৃষি জমির মূল্য মাত্র সাড়ে ১৪ লাখসহ মোট সম্পত্তি ৯০ লাখ টাকা তিনি উল্লেখ করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

শেখ এনামুল গত ৭ ডিসেম্বর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী চলতি দায়িত্ব পদে পদোন্নতি পান এবং গত ১ জানুয়ারি গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর এক প্রজ্ঞাপনে বরগুনা গণপূর্ত বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী পদে পদায়ন করেন। বরগুনা গণপূর্ত বিভাগে গিয়েও তিনি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে ৫% কমিশন ছাড়া বিল ভাউচারে স্বাক্ষর করতেন না বলে একাধিক ঠিকাদার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। বরগুনায় ৮ মাস থাকাকালীন ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল নির্মাণ ও চীফ জুডিশিয়াল আদালত ভবণ নির্মাণে আর্থিক অনিয়মের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে আবেদন করেছেন তাহজীবুল উম্মাহ মডেল মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক মোঃ জাকারিয়া। গত ২১ সেপ্টেম্বর ডাকযোগে পাঠানো ওই আবেদনে পুরোপুরি কাজ শেষ না করেই আংশিক বিল ছাড়করণ, কাজের মান তদারকি না করে বিল ছাড়করণসহ ঠিকাদারদের সাথে কমিশনের বিনিময়ে যোগসাজোশ করে আর্থিক অনিয়মসহ দায়িত্বে অবহেলাজনিত শেখ এনামুলের বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া গোপালগঞ্জে আলিশান বাড়ী, ২০ এক জমি এবং নামে বেনামে প্রায় ১০ কোটি টাকা রয়েছে বলে ওই আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও মিরপুরে উপসহকারী ও সহকারী প্রকৌশলী থাকাকালীন ঠিকাদারদের সাথে সিন্ডিকেট, বিভিন্ন সরকারি নির্মাণকাজের দরপত্র ও কার্যাদেশকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন, বিশেষ করে মিরপুরে সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি আবেদন গতকাল দুদকে জমা পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। যদিও তিনি এখন বরগুনা থেকে বদলি হয়ে রাঙামাটির কাপ্তাই গণপূর্তের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে চলতি দায়িত্বে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে।

জন্ম সনদে গরমিল:

শেখ এনামুলের জন্ম সনদ নিয়ে গরমিল পাওয়া গেছে। একাত্তর সালে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে তিনি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে জন্মগ্রহণ করেন। যদিও জাতীয় পরিচয় পত্রে শেখ এনামুলের জন্ম তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭৫ সাল উল্লেখ রয়েছে। চাকুরীক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা ভোগ করার জন্য প্রকৃত বয়সের তথ্য গোপন করে ৩ বছর কম দেখানো হয়েছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। এছাড়াও স্থায়ী ঠিকানা কাশিয়ানী উপজেলার সাজাইল ইউনিয়নের মহানাগ গ্রামে হলেও জাতীয় পরিচয় পত্রে গোপালগঞ্জ সদরের ১১, মৌলভী পাড়া দেখানো হয়েছে। ওই বাড়ীটিও অন্তত কয়েক কোটি টাকা খরচ করে দৃষ্টিনন্দন করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ এনামুল হকের ব্যক্তিগত মোবাইলে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। এছাড়া মোবাইলে ক্ষুদে বার্তা দিলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।