ঢাকা | আগস্ট ৩০, ২০২৬ - ৫:৫১ অপরাহ্ন

শিরোনাম

স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না: রাষ্ট্রপতি

  • আপডেট: Sunday, August 30, 2026 - 11:18 am
  • পঠিত হয়েছে: 2 বার

টাচ নিউজ : স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো ‘আয়নাঘর’ থাকবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধী যত ক্ষমতাবানই হোক, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে এবং আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। রোববার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, গুম কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। গুমের মাধ্যমে শুধু একজন মানুষকে নিখোঁজ করা হয় না, তার পরিবার-পরিজনের হাসি, শান্তি, স্বপ্ন এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্তিত্বও কেড়ে নেওয়া হয়। এটি একটি জঘন্য মানবাধিকার লঙ্ঘন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা এবং মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা দিয়েছে। কিন্তু গুম ও নির্যাতনের মাধ্যমে এসব মৌলিক অধিকার একসঙ্গে লঙ্ঘন করা হয়। গত দেড় দশকের প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিগত সরকারের সময়ে গুম এবং গোপন বন্দিশালা ‘আয়নাঘর’-এর দুঃসহ থাবা বাংলাদেশের ওপর চেপে বসেছিল। অন্যায়ের প্রতিবাদ, ভিন্নমত প্রকাশ কিংবা গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যুক্ত ব্যক্তিদের তুলে নিয়ে গুম ও গোপনে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসব ঘটনার যথাযথ তদন্ত ও স্বীকৃতির পরিবর্তে দীর্ঘদিন এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলম এবং সাজেদুল ইসলাম সুমনসহ নিখোঁজ ব্যক্তিদের কথা উল্লেখ করেন।এ ছাড়া ব্যারিস্টার আরমান, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল আজমীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে দীর্ঘদিন গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখার অভিযোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তাকেও গুম করে বিদেশে ফেলে আসা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ফিরে এলেও এখনো অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন।

‘প্রতিশোধ নয়, প্রতিকার’

রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে গণতন্ত্র, সাম্য, বাকস্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, গুম-নির্যাতনের সংস্কৃতি সেই চেতনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তিনি বলেন, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফ্যাসিবাদ দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। এখন প্রতিশোধ নয়, প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে আইনানুগ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তিনি গুম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন, একদিন বাংলাদেশেই এসব অপরাধের বিচার হবে।

তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে ১,৫৬৯ গুমের ঘটনা:

গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ তুলে রাষ্ট্রপতি বলেন, কমিশন ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এসব ঘটনার মধ্যে ২৮৭ জন নিখোঁজ ও মৃত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়া এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের বেছে বেছে জোরপূর্বক গুম ও গোপনে হত্যার যে চিত্র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, তা রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার উদ্দেশ্যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনার ইঙ্গিত দেয়।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর দায়িত্ব নেবে রাষ্ট্র:

রাষ্ট্রপতি বলেন, শুধু অপরাধীদের শাস্তি দিলেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হবে না। বছরের পর বছর প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোকে সীমাহীন অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট ও মানসিক যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। এসব পরিবারের মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, শিক্ষা, জীবিকা ও পুনর্বাসনের দায়িত্বও রাষ্ট্রকে নিতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুম ও গণহত্যার বিচারের কাজ স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বাংলাদেশ চাই না’

রাষ্ট্রপতি বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু ভয়ভীতির সংস্কৃতি থাকবে না। তিনি বলেন, রাষ্ট্রে আইনশৃঙ্খলা থাকবে, তবে আইনের নামে মানবাধিকার ও সুবিচার লঙ্ঘনের সুযোগ থাকবে না। রাষ্ট্রের ক্ষমতা থাকবে, কিন্তু সেই ক্ষমতার ওপর সংবিধান ও আইনের নিয়ন্ত্রণ থাকবে। রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক এবং তার নাগরিকরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করতে পারছেন—সেটিই রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়ন ও সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠি। সবশেষে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এই স্বাধীন বাংলাদেশে আর কোনো আয়নাঘর থাকবে না। আর কোনো মাকে সন্তানের জন্য, কোনো স্ত্রীকে স্বামীর জন্য চোখের পানি ফেলতে হবে না।’ তিনি আরও বলেন, গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধী যত বড় ক্ষমতাবানই হোক না কেন, তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে। আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশে যাতে আবার ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গুমের শিকার পরিবারগুলোর পাশে রাষ্ট্র আন্তরিকভাবে দাঁড়াবে বলেও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রপতি।