হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক সাবেক এমপি খোকার তিন ভাতিজা
নিজস্ব প্রতিবেদক: জাতীয় পার্টির নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার তিন ভাতিজার বিরুদ্ধে হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ নানা অপকর্মের অভিযোগ উঠেছে। এসকল জ্ঞাত আয় বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার, দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অনুসন্ধানের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে একটি আবেদন জমা পড়েছে।
দুদকে করা আবেদনে উল্লেখ করা হয়, নারায়ণগঞ্জ-৩ সংসদীয় আসনের সাবেক এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার ভাতিজা আহমেদ হোসেন হিরু, মো: শামীম মিয়া ও মো: জাবেদ হোসেন নানা অপকর্মসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংগঠিত করে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে কয়েক হাজার কোটি টাকার জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদের মালিক হয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে এসব ব্যক্তি বিভিন্ন গুরুতর অপরাধমূলক ও দুর্নীতিসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলেও ভুক্তভোগী ও গ্রামের সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না। তাদের বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত এবং তদন্ত সাপেক্ষে বিচার হওয়া প্রয়োজন।
দুদকে করা আবেদনে জানানো হয়, এমপি খোকার ভাতিজা আহমেদ হোসেন হিরু আওয়ামী লীগ কর্মী ইকবালের মাধ্যমে জাহাজ ডাকাতি করে এনে তা কেটে গর্দা (স্ক্র্যাপ) হিসেবে বিক্রি করেন। এছাড়াও ডাকাতি করা জাহাজের ভুয়া কাগজ বানিয়ে রেজিস্ট্রেশন নম্বর পরিবর্তন করার মাধ্যমে তা বিক্রি করে। সম্প্রতি খবির হাওলাদার নামে এক জাহাজ ব্যবসায়ীর জাহাজ ভাড়ায় এনে তা বিক্রি করার চেষ্টা চালাচ্ছে হিরুর সিন্ডিকেট।
সোনারগাঁ উপজেলার মোগড়াপাড়া এলাকায় হিরু ও তার ভাইয়েরা আওয়ামী সরকারের আমল থেকে “ঈসাখাঁ রিসোর্ট” নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছে। যেখানে অবৈধ দেহব্যবসা, মাদক সেবন ও বিক্রি, এবং জুয়ার আসর পরিচালনা করা হতো।আওয়ামী সরকারের আমলে স্থানীয়রা ভয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহাস পাননি। ইদানীং এসব অনৈতিক বিষয় লোকমুখে ছড়িয়ে পড়লে রিসোর্টটিতে একটি বাফেট লাউঞ্জ চালু করা হয়। এখনো প্রতিষ্ঠানটিতে ক্ষুদ্র পরিসরে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। হিরুর ছেলে শাহেদ সন্ত্রাসী বাহিনী দ্বারা এসব পরিচালনা করে। শাহেদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। শাহেদ এলাকার সাধারন মানুষের কাছে মূর্তিমান আতঙ্ক।
আবেদনকারী আরো বলেন, হিরু ও তার ভাইদের নিয়ন্ত্রণে বা পরিচালনায় প্রক্সি অন্তঃজেলা একটা ডাকাত বাহিনী আছে। যারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত ডাকাতি করে। এছাড়াও হিরুদের বিরুদ্ধে কেউ কথা এসব ডাকাত দিয়ে প্রকাশ্যে ওই ব্যক্তির উপর হামলা চালায়। তাই ভয়ে এলাকার কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলে না।
তিনি বলেন, হিরুর পরিবার ও তাদের কিছু আত্মীয়ের সাথে নারায়ণগঞ্জের সেভেন মার্ডারের মাস্টারমাইন্ড নূর হোসেনের আত্মীয়তা রয়েছে। নূর হোসেন জেলে যাওয়ার পর তার মাদক সম্রাজ্য এসব ব্যক্তি পরিচালনা করছে। তারা এই এলাকায় মুখোশের আড়ালে একের পর এক সন্ত্রাসী তৈরী ও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু অবৈধ টাকার জোড়ে এখনো পর্যন্ত ধরা ছোঁয়ার বাইরে। হিরুদের তৈরী সন্ত্রাসীদের মধ্যে অন্যতম ছিলো গিট্টু রিদয়। বিগত সরকারের আমলে এই গিট্টু রিদয়কে দিয়ে এলাকায় হাসনাত হত্যাকান্ডসহ একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটায়। পরে র্যাবের ক্রসফায়ারে রিদয়ের মৃত্যু হয়। সন্ত্রাসী রিদয়ের মৃত্যুর পর তার সকল অবৈধ সম্পদের দখল নেয় হিরু ও তার কিছু নিকট আত্মীয়। এমনকি রিদয়ের বোন ছাড়া সকল ওয়ারিশকে পরিকল্পিত হত্যা করে স্বাভাবিক মৃত্যু বলে চালিয়ে দেয়।
আবেদনে আরো বলা হয়, আহমেদ হিরুর এক নিকট আত্মীয় সমাজ সেবকের নামে পুরো জেলায় মাদকব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। বিগত সরকারের আমলে তার মালিকানাধীন জাহাজ মাদকসহ আটক হলে মোটা অংকের মাধ্যমে ধামাচাপা দেয়া হয়। যার মধ্যস্ততা করেছেন তৎকালীন আওয়ামী লীগের এক প্রভাবশালী নেতা। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে তাকে হত্যা করা হয়। সম্প্রতি হত্যার উদ্দেশ্যে তাদের সন্ত্রাসী বাহিনী একাধিক স্থানীয় মানুষের উপর হামলা চালিয়েছে। যার সবকিছুর সাথে হিরুর পরিবার জড়িত।
অভিযুক্ত হিরুর ছোট ভাই শামীম হোসেনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহিঃর্ভূত সম্পদ অর্জন ও দেশের বাইরে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের মাধ্যমে দেশের বাইরে বিপুল পরিমান সম্পদ গড়ার কথা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। এছাড়াও লিয়াকত হোসেন খোকা এমপি থাকা অবস্থায় প্রভাব খাটিয়ে হিরু ও তার ভাইরা বহু মানুষের জমি জোরপূর্বক দখল করেন। “লিজা পাম্প” নামে একটি পেট্রোল পাম্প দখল করে সেখানে ও সরকারি সড়কের ওপর অবৈধ বাজার বসিয়ে বিপুল অর্থ উপার্জন করছেন। সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং উপজেলা প্রশাসন একাধিকবার উচ্ছেদ করলেও পুনরায় অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে দোকান বসানোর অভিযোগ রয়েছে।
দুদকে করা আবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, হিরুর ভাই জাবেদ তার অবৈধ সম্পদ গোপন রাখার উদ্দেশ্যে কর্মচারী ও ঘনিষ্ঠজনদের নামে জমি ক্রয় করেন এবং পরবর্তীতে সেগুলো নিজ স্ত্রী বা অন্যদের নামে হস্তান্তর করেন—এমন অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও এই জাবেদ যেসকল মোবাইল সিম ব্যবহার করেন তার সবগুলো অন্যকোনো ভুয়া ব্যক্তির নামে রেজিষ্ট্রেশনকৃত। যার ফলে তার অবৈধ কর্মকান্ড নিরাপদে পরিচালনা করতে সক্ষম হন।
এছাড়াও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় হিরু ও তার ভাইদের বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্টরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। স্থানীয় থানার শীর্ষ কর্তাদের নিয়মিত টাকা দিয়েই তারা গ্রেফতার এড়িয়ে চলছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয় জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রিক কিছু ডাকাত ও বিভিন্ন ধরনের অপরাধী আছে। এ বিষয়ে যে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে সেটি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত আহমেদ হোসেন হিরু বলেন, আমাদের দল ক্ষমতায় নেই তাই আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এসব অভিযোগ মিথ্যা বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রাষ্ট্রবিরোধী একাধিক মামলার আসামী হওয়া সত্ত্বেও অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হচ্ছে না কেনো? এমন প্রশ্নের জবাবে সোনারগাঁ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, সোনারগাঁ থানা পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতার করতে তৎপর রয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংগঠিত করার প্রমাণ মিলছে তাদের গ্রেফতারের জন্য অভিযান অব্যহত রয়েছে।











