টাচ নিউজ ডেস্ক: বিশ্ব ব্যাংক-এর অর্থায়নকৃত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক সারাদেশ ব্যাপি বাস্তবায়নাধীন কৃষি মন্ত্রণালয়ের “কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্প” কর্তৃক আয়োজিত  এক “জাতীয় কর্মশালা” অনুষ্ঠিত হয়।

 রবিবার (১৩ জুন)  কৃষিবিদ ইনষ্টি্টিউট বাংলাদেশ (কেআইবি) কমপ্লেক্স, ফার্মগেট, ঢাকা-এর থ্রি ডি সেমিনার হলে এ কর্মশালায় প্রধান অতিথির আসন অলংকৃত করেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকার মহাপরিচালক কৃষিবিদ মোঃ আসাদুল্লাহ এবং সভাপতিত্ব করেন ডিএই’র সরেজমিন উইং-এর পরিচালক কৃষিবিদ এ কে এম মনিরুল আলম।

কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকার প্রশাসন ও অর্থ উইং-এর পরিচালক কৃষিবিদ কাজী আব্দুল মান্নান, পরিকল্পনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন ও আইসিটি উইং-এর পরিচালক কৃষিবিদ শ্রীনিবাস দেবনাথ, প্রশিক্ষণ উইং-এর পরিচালক কৃষিবিদ মোঃ আলীমুজ্জামান মিয়া এবং ক্রপস উইং-এর পরিচালক খন্দকার আব্দুল ওয়াহেদ।

স্বাগত বক্তব্য এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন “কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্প”-এর সন্মানিত প্রকল্প পরিচালক ড. মোঃ শাহ কামাল খান। কর্মশালায় সন্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য প্রদান করেন বিসিএস (কৃষি) এসোসিয়েশনের সভাপতি কৃষিবিদ মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সদর দপ্তর ও মাঠ পর্যায়ের অতিরিক্ত পরিচালক ও উপপরিচালকগণ, প্রকল্প পরিচালকগণ, কর্মসূচী পরিচালকগণ, উপ-প্রকল্প পরিচালকগণ উক্ত কর্মশালায় অংশগ্রহন করেন। কৃষি মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিনিধিগণ, কৃষি তথ্য সার্ভিসের প্রতিনিধিগণ, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান যেমন: বিএআরআই, বিআরআরআই, বিজেআরআই, বিএসআরআই-এর বিঙ্গানীগণ; বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর প্রতিনিধিগণ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিগণ, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার প্রতিনিধিগণসহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের উপস্থিতিতে কর্মশালাটি সাফল্যমন্ডিত হয়।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি মহাপরিচালক কৃষিবিদ মোঃ আসাদুল্লাহ তাঁর বক্তব্যে বলেন, প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ও যুগোপযোগী। বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্নতা অর্জন করেছে, এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য কৃষি আবহাওয়া সংক্রান্ত জরুরী বার্তা সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট দ্রুত সময়ে পৌঁছানো প্রয়োজন। আর এই গুরুত্বপূ্র্ন দায়িত্ব সফলতার সাথে পালন করে যাচ্ছে এ প্রকল্প। কৃষি গবেষকদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে লবনাক্ত এলাকা ও প্রতিকুল পরিবেশে ফসল উৎপাদন ও ফলন বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি কৃষি আবহাওয়ার আগাম তথ্যাদি জানতে প্রকল্প থেকে সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধি ও প্রান্তিক পর্যায়ে কৃষকদের তাৎক্ষণিক তথ্যাদি সরবরাহ করতে উপস্থিত মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রতি আহবান জানান। মহাপরিচালক আরও বলেন, কৃষি বান্ধব সরকারের সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে আমরা খোরপোশের কৃষি থেকে বেরিয়ে এখন বানিজ্যিক কৃষিতে প্রবেশ করেছি।

অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকার বিভিন্ন উইং-এর পরিচালকগণ এবং অনুষ্ঠানের সভাপতি তাদের বক্তব্যে বলেন, প্রকল্পটি ব্যাতিক্রমধর্মী, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ও যুগোপযোগী। সিজোনাল ফোরকাষ্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। এটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের জন্য ফলপ্রসু হবে, যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনে সহায়ক হবে। এ প্রকল্পের সাথে বিদেশী সংস্থাসমূহের সংশ্লেষ, আগ্রহ ও সহযোগিতা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। কৃষি আবহাওয়া প্রকল্পের কার্যক্রম ও সেবা অত্যন্ত ফলপ্রসু। এ প্রকল্পের সেবাসমূহ যথাযথভাবে বিস্তার ঘটাতে পারলে দেশের কৃষি ও কৃষকের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হবে, ২০৩০ সালের মধ্যে ফসল উৎপাদন প্রায় ডাবল এবং এসডিজি অর্জন করা সম্ভব হবে।

প্রকল্প পরিচালক ড. মোঃ শাহ কামাল খান যথোপযোগী তথ্য-চিত্র-ভিডিও এর সমন্বয়ে প্রস্তুতকৃত একটি স্মার্ট পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশানের মাধ্যমে অত্যন্ত সুন্দর ও দক্ষতার সাথে স্বাগত বক্তব্য এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। “ঠান্ডা গরম বন্যা খরা কিংবা জলোচ্ছাস, বাঁচিয়ে দিবে ঠিক সময়ে একটু পূর্বাভাস” প্রকল্পের এই স্লোগান দিয়ে বক্তব্য শুরু করেন।

তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম সারিতে। কাজেই নির্ভরযোগ্য কৃষি আবহাওয়া বিষয়ক তথ্য কৃষকদের মাঝে সময়মত পৌঁছে দেওয়া কৃষি প্রধান বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে প্রতিকূল আবহাওয়ার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে যেমন ফসল রক্ষা করা যাবে তেমনি অনুকূল আবহাওয়াকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বাড়ানো যাবে। সে কারণেই বিশ্বব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় এ প্রকল্পটি সারাদেশ ব্যাপি কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো- কৃষি উৎপাদন টেকসই করার লক্ষ্যে কৃষকের কাছে কৃষি আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং আবহাওয়া ও জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাবসমূহের সাথে কৃষকের খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন, স্মার্ট এবং যুগোপযোগী একটি প্রকল্প। ফসল উৎপাদন করে কৃষকের লাভবান হওয়া নির্ভর করে মূলতঃ তিনটি বিষয়ের উপর-
ক) সময়মত ও যথাযথ ফসল ব্যবস্থাপনা
খ) ফসলের উৎপাদন খরচ কমানো
গ) নিরাপদে ফসল কর্তন ও ব্যবস্থাপনা।

প্রকল্পটি উল্লেখিত তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে যথোপযোগী পরামর্শ কৃষকদের প্রদান করে যাচ্ছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য কৃষি আবহাওয়া এবং জলবায়ু বিষয়ক ঝুঁকি সংক্রান্ত তথ্য উপাত্ত কৃষকের উপযোগী করে প্রস্তুত করে তা বিভিন্ন সম্প্রসারণ পদ্ধতির মাধ্যমে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৪০৫১ টি ইউনিয়ন পরিষদে অটোমেটিক রেইনগজ ও কৃষি আবহাওয়া ডিসপ্লে বোর্ড স্থাপন, ৪৮৭টি উপজেলায় কিওস্ক স্থাপন এবং এসএএওদের কৃষি আবহাওয়া বিষয়ক তথ্য প্রেরণের জন্য ইন্টারনেট কানেক্টিভিটিসহ ৬৬৬৪টি ট্যাব সরবরাহ করা হয়েছে।

কিওস্ক ব্যবহার করে কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট যে কোন ব্যক্তি কৃষি আবহাওয়া তথ্য পোর্টাল (bamis.gov.bd), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (dae.gov.bd), বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (bmd.gov.bd), বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (ffwc.gov.bd) থেকে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ওয়েবসাইট পরিদর্শন ও প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহ/প্রিন্ট করে নিতে পারেন। সর্বসাধারণের সহজে ব্যবহারের জন্য এ কিওস্কটি সকাল ৯.০০ টা থেকে বিকাল ৫.০০ টা পর্যন্ত দেশের সকল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়ের উন্মুক্ত স্থানে রাখা থাকে।

প্রকল্পের আওতায় নিয়মিত সপ্তাহে দুইদিন ৬৪ জেলার জন্য এবং একদিন জাতীয় পর্যায়ের জন্য কৃষি আবহাওয়া বুলেটিন তৈরি, বামিস পোর্টালে আপলোড ও সম্প্রসারণ করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ (ঘূর্ণিঝড় ফণী, বুলবুল, বন্যা ও আকস্মিক বন্যা, শৈত্য প্রবাহ, আম্ফান প্রভৃতি) এর আগে ও পরে করণীয় সম্পর্কে সচেতন করে বিশেষ কৃষি আবহাওয়া বুলেটিন প্রদান করা হয়।

অত্যন্ত দক্ষ ও মেধাবী এই কর্মকর্তা আরও জানান, প্রকল্পের আওতায় সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষক গ্রুপ থেকে কৃষক প্রতিনিধির নাম, ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর সম্বলিত ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে। এ ডাটাবেজে ১৫০০০ সুনামধন্য ও প্রতিষ্ঠিত কৃষক গ্রুপ থেকে ৩০০০০ প্রগতিশীল, কর্মঠ ও নেতৃত্বদানকারী কৃষক প্রতিনিধির তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এসএমএস ও আইভিআর (ভয়েস ম্যাসেজ)-এর মাধ্যমে জরুরি অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে উক্ত কৃষকদের নিয়মিত অবহিত করা হয়ে থাকে। উল্লেখিত কৃষক প্রতিনিধিগণ প্রাপ্ত তথ্য তাদের গ্রুপের ও পার্শ্ববর্তী অন্যান্য কৃষকদের মাঝে বিস্তার করে থাকেন। কৃষক প্রতিনিধির পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দের কাছেও এসএমএস পৌঁছানো হয়। প্রাপ্ত তথ্য ও কৃষি আবহাওয়া পরামর্শ কাজে লাগিয়ে কৃষকগণ প্রতিকূল আবহাওয়া মোকাবিলার পাশাপাশি অনুকূল আবহাওয়ায় করণীয় বিষয়ক তথ্যসমূহ সদ্ব্যবহার করে মাঠের ফসল রক্ষা, সঠিকসময়ে ফসলের যথাযথ ব্যবস্থাপনা, অর্থের সাশ্রয় এবং উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পারেন। প্রকল্প থেকে সরবরাহকৃত কৃষি আবহাওয়া সংক্রান্ত সরন্জামাদি যেমন: কিওস্ক, অটোমেটিক রেইনগজ, ট্যাব, আবহাওয়া ডিসপ্লে বোর্ড প্রভৃতির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের কৃষি ও কৃষকের দৃষ্টান্তমূলক উন্নয়ন ঘটানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন।

কর্মশালার কারিগরী সেশনের সভাপতি ডিএই’র সাবেক মহাপরিচালক কৃষিবিদ ড. মোঃ আব্দুল মুইদ তার বক্তব্যে বলেন, কর্মশালা থেকে প্রাপ্ত তথ্য, ঙ্গান, প্রযুক্তি ও অনুপ্রেরণা মাঠে যথাযথভাবে প্রয়োগ করে দেশের কৃষি উন্নয়নে অবদান রাখতে পারলে এ কর্মশালার আয়োজন সফল হবে, সার্থক হবে। প্রকল্প থেকে সরবরাহকৃত কৃষি আবহাওয়া সংক্রান্ত সরন্জামাদি যেমন: কিওস্ক, অটোমেটিক রেইন গেজ, ট্যাব, আবহাওয়া ডিসপ্লে বোর্ড প্রভৃতির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে একদিকে প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জিত হবে অন্যদিকে দেশের কৃষি ও কৃষকের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হবে। পরিশেষে কর্মশালায় সক্রিয় অংশগ্রহনের মাধ্যমে সফল করার জন্য প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথিবৃন্দ ও অংশগ্রহনকারীদেরকে ধন্যবাদ ঙ্গাপন করেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে