অর্নিতা দাস অর্নি: আমি তখন ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নামক যুদ্ধক্ষেত্রে ভর্তির হওয়ার জন্য একজন উদগ্রব ভর্তিযোদ্ধা। পিসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হওয়ার জন্য বোঝার পর থেকে ঢাবি আমার কাছে স্বপ্ন হয়ে যায়। আমি ক্লাস নাইন থেকে আর্টস নিয়ে পড়ি কারণ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া আমার স্বপ্ন ছিলোনা।

ঢাবি নামক স্বপ্নের বীজ বপন করেছেন আমার বাবা। আর প্রতিনিয়ত আমার স্বপ্নের বীজে জল ঢালতেন আমার লক্ষ্য মনে করিয়ে দিয়ে। মাধ্যমিক পরীক্ষার পর আমি বাড়ির বাইরে কলেজে পড়া শুরু করি। পাগলের মতো পড়তাম একটা সময় হয়তো এই পরিশ্রমের সান্ত্বনা পুরষ্কার হিসেবে কলেজে মডেল টেস্টে হাইয়েস্ট মার্ক পেয়ে ফার্স্ট হয়েছিলাম। যেটা আমার কল্পনার বাইরে ছিলো।

তারপর অকল্পনীয় একটা ঝড় বয়ে যায় জীবন, কিছুটা সময়ে থমকে ছিলাম তারপর আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ ভর্তির জন্য প্রস্তুতি নেয়া শুরু করি। ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে আমি বাড়িতে আসি। পরের দিন সকালে আমি আমার জীবনের মূল্যবান ব্যক্তি আমার মা কে হারিয়ে ফেলি।

তার দুই দিন পর আমার স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। আমার বাড়ি থেকে ঢাকা যেতে ১ দিন লাগে। বাবা-মা মৃত্যুর শোক যার বাবা মা মারা যায় নি তার পক্ষে অনুভব করা সম্ভব না। কথায় আছে, মায়ের সাথে নাড়ির সম্পর্ক থাকে। বাস্তবিক অর্থে তাই যখন মা মারা যায় ঠিক নাড়ি ছেঁড়া এক ব্যথা অনুভব হয় যা চোখের দুফোঁটা জলেও সামলায় না। জীবনে কঠিন সময়ের সিদ্ধান্ত তখন নিয়ে ছিলাম। আমার কোনো সেন্স ছিলো না। আমি কাঁদতে পারছিলাম না চুপ হয়ে গেছিলাম। আমার মাথায় কোনো কাজ করছিলোনা কোনো ভাবনা ও আসছিলো না।

২০ সেপ্টেম্বর সকাল। আমার দাদা আমাকে জিজ্ঞেস করলো,” তুই কি ঢাকা ভার্সিটির পরীক্ষা দিবি, দিলে আজই তোর ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে।” আমি কিছু বললাম না। মাথায় মধ্যে ভন ভন করতেছে। ওর সর্বশেষ কথা আমাকে সেদিন সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিলো, ” তুই যদি পরীক্ষা না দিতে চাস কোনো সমস্যা নাই কিন্তু এইজন্য সবাই আমাদের মাকে দোষারোপ, বলবে নিজেও মরলো মেয়েটাকেও মেরে গেলো। তুমি পরীক্ষা দে চান্স না পাস সে আলাদা কথা কিন্তু শোক কেটে গেলে সারাজীবন না পস্তাতে হয়!” দাদার এই একথায় আমি মাথা নাড়লাম, মাতৃহীনা শোক নিয়ে ঢাকা রওনা হলাম। এক ঘোরের মধ্যে কাটাচ্ছিলাম সময়টা। পরীক্ষা দিলাম। সেই সময়ে কাটানো দিনগুলো দুঃস্বপ্নের মতো, এখনো মনে করলে শিউরে উঠি।

বছর ঘুরে ৩ বছর হলো মা আজ নেই। মা শুনছো! ” আমি এখন আমার স্বপ্নের বিদ্যালয়ে ঠাঁই পেয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী আমি। বাড়িতে ৬ মাস আছি। জীবনের শূন্যস্থান সাময়িক খুশি আর ব্যস্ততা দিয়ে হয়তো ভরাট করার চেষ্টা করা যায় তবে মা-বাবার শূন্যস্থান হয়তো এক জীবনে পূরন করা যায় না। অতীতের ঘটে যাওয়া সবটাই এখন গল্প, আমার জীবনের গল্প। ফেলে আসা দিনগুলো শুধু ই স্মৃতি যা ক্ষনে ক্ষনে নাড়ি ছেড়া বেদনা অনুভব করায়।

চোখ বন্ধ করলে কল্পনায় মায়ের এই সময়কার রূপটাই আসে। বাঁধনো ছবিতে যেমন মাকে দেখা যায়, তেমন দেখিনা। তাই এলবাম ঘেঁটে এই ছবিটা বের করলাম।

লেখক: সংগীত বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। (ফেইসবুক থেক সংগৃহিত)

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে