মোহাম্মদ বেলাল হোসেন চৌধুরীঃ “উনি যত্ন করে বাংলা লেখেন! হ্রস্ব-ইকার, দীর্ঘ-ইকার, চন্দ্রবিন্দুও নির্ভুল। বাংলা বানান ভুল দেখলে আমার খুব রাগ হয়!”বলছিলেন জিওসি। বড় মানুষের অনুপ্রেরণাও বড়! দেশের একজন ব্যস্ত জেনারেল আমার লেখা পড়েন জেনে আমি আপ্লুতও।

জিওসি পদে কুমিল্লায় যোগদানের পর প্রথম সাক্ষাতেই মুগ্ধতা! এসি, এডিসিসহ তিন জনই ঐকমত্যে। তাঁর অনুপ্রেরণা ও সৌজন্যে অর্ধমৃতও প্রাণবন্ত! অসংখ্য এমন দুর্লভ নজির তাঁর। সব ছাপিয়ে কুরআনের ওপর তাঁর অগাধ জ্ঞান! অনর্গল তেলাওয়াত, অনুবাদ, তাফসীর ব্যাখ্যা অবিশ্বাস্য মুগ্ধতায় ভরা, সপ্রতিভ ব্যঞ্জনাময়। দেশপ্রেম, সততা, নিষ্ঠা, দৃঢ়তা ও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ববোধ, নিরাসক্ত মনোবৃত্তি, শৃংখলা, কর্তব্যপরায়নতা ও পেশাদারিত্বের অপূর্ব সম্মিলন মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর হারুন। তাঁর সম্পর্কে পৃথক নিবন্ধ লেখার অভিপ্রায় আছে।

দু’দিন আগে ডিসি ফখরুল আমিন বললো, “স্যার, জিওসি মহোদয় বিজিবি কুমিল্লার সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকছেন, বিজিবি আপনার উপস্থিতি আশা করে’। এ বছর ১৯ ও ২০ ডিসেম্বর বিজিবি দিবস পালিত হচ্ছে।

জিওসি মহোদয়ের আকর্ষণেই এনবিআরের জুম সভা অর্ধেক রেখেই যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। সদস্য মহোদয়কে জানাতেই তিনি আজ্ঞা দিলেন। মধ্যেই দুপুর ১২টায় পৌঁছেই বিস্ময়। তাঁর বাঁ পাশের আসন খালি। ভিআইপির জন্য ওটা রেখে আমি দু’আসন দূরে গিয়ে বসলাম। তিনি ডেকে পাশে নিয়ে গেলেন। মাননীয় এমপির সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তাঁর স্বভাবসুলভ দেশপ্রেম ও দায়িত্ববোধ নিয়ে বলছেন। দেশাত্মবোধে সিক্ত একজন মানুষের হৃদয় ভেজা বাক্যেই যেন ‘উক্তি’! আমাকে গলফ খেলার আমন্ত্রণের মধ্য দিয়ে এ পর্ব শেষ করলেন।

বিজিবি দিবস প্রসঙ্গে কিছু বলা দরকার! বেনাপোলে আড়াই বছর এ সংস্থার সাথে নিবিড় কাজ করেছি। বিজিবি দিবসে ২০১৯এ শুভেচ্ছা জানিয়েছি। কুমিল্লায় বিজিবির পুর্ণাঙ্গ সেক্টর কাজ করে।

বিজিবি পরিক্রমাঃ
১. বিজিবি দেশের সবচেয়ে পুরনো সসস্ত্র সংস্থা! প্রায় ২২৬ বছর আগে বিজিবির জন্ম। সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বিজিবি! সীমান্ত সুরক্ষা, চোরচালান দমন, নারী, শিশু মানব পাচাররোধ, মাদক স্বর্ণ অবৈধ পণ্য পাচাররোধ ও সামগ্রিক সীমান্ত নিরাপত্তায় কাজ করে এ সংস্থা। অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায়ও দেশে প্রয়োজনে কাজ করে।

২. কাস্টমস আইনের বেশ কয়েকটি ধারায় কাস্টমস কর্মকর্তার মতো কাজ করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে বিজিবিকে।

৩. গঠন ও প্রেক্ষপটঃ
▪️১৭৯৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী ‘ফ্রন্টিয়ার প্রটেকশন ফোর্স’ নামে গঠন করে।
▪️১৭৯৫ সালের ২৯ জুন নাম পরিবর্তন করে ‘রামগড় লোকাল ব্যাটালিয়ন’ হয়ে এবাহিনীর যাত্রা শুরু। ৪৪৮ জন সদস্য, দু’টি অনিয়মিত অশ্বারোহী দল ও চারটি কামান নিয়ে এর শুরু।
▪️১৮৬১ সালে পূর্বাঞ্চলের পুলিশ বাহিনীর সদস্য নিয়ে ‘ফ্রন্টিয়ার গার্ডস’ নামে পুনর্গঠিত হয়।
▪️১৮৭৯ সালে ‘স্পেশাল রিজার্ভ কোম্পানী’ নামে পিলখানায় প্রথম ঘাঁটি স্থাপন করে।
▪️১৮৯১ সালে নতুন নামকরণ করা হয় ‘বেঙ্গল মিলিটারি পুলিশ’।
▪️১৯২০ সালে এর জনবল ও শক্তি বৃদ্ধি করে ১৬ টি প্লাটুন সমন্বয়ে ‘ইস্টার্ণ ফ্রন্টিয়ার্স রাইফেলস’ নামকরণ করা হয়
▪️১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর নামকরণ করা হয় ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস)।
▪️১৯৪৮ এর পর দক্ষ নেতৃত্ব ও দিক-নির্দেশনার প্রয়োজনে সামরিক বাহিনী থেকে অফিসার নিয়োগ করা হয়।
▪️১৯৫৮ সালে এবাহিনীকে চোরচালান দমনের দায়িত্ব দেয়া হয় ।
▪️১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত এ বাহিনীর জনবল ১৩,৪৫৪ জনে উন্নীত হয়।
▪️১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাক-হানাদার বাহিনী প্রথমে ঢাকার পিলখানাস্থ ইপিআর সদর দপ্তর আক্রমণ করে । এবাহিনী বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার বার্তা ওয়ারলেস যোগে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়।

৪. মুক্তিযুদ্ধে বিজিবি’র অবদানঃ
১৯৭১ এ মুক্তিযুদ্ধে এবাহিনীর ৮১৭ জন সৈনিক শহীদ হন। এঁদের মধ্যে শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ এবং শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আবদুর রউফ সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীর শ্রেষ্ঠ’ পদক পান। এছাড়া ৮ জন ‘বীর উত্তম’, ৩২ জন ‘বীর বিক্রম’ ও ৭৮ জন ‘বীর প্রতীক’ খেতাব পান।
১৯৭২ এর ০৩ মার্চ স্বাধীনতার পর এবাহিনীর নামকরণ করা হয় ‘বিডিআর’ (বাংলাদেশ রাইফেলস)।

৫. স্বীকৃতিঃ
১৯৮০ সালের ৩মার্চ বাংলাদেশ সরকার এর কর্মকান্ডের বিশেষ স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় পতাকা প্রদান করে।

৬. বিজিবি আইন ও নামকরণঃ
২০০৯ সালের ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি বাহিনীর সদর দপ্তর, পিলখানায় সংঘটিত বর্বরোচিত হত্যাকান্ডে ৫৭ জন সেনাকর্মকর্তাসহ ৭৪ জন নিহত হয়।
২০১০ সালের ০৮ ডিসেম্বর মহান জাতীয় সংসদে’বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ আইন, ২০১০’ পাশ ও ২০ডিসেম্বর কার্যকর হয়। মূলত মর্মান্তিক ঐ ঘটনার পর বাহিনী পুনর্গঠনের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল।

২০১১ তারিখে ২৩ জানুয়ারী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাহিনীর সদর দপ্তরে ‘বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ’ (বিজিবি) এর নতুন পতাকা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তোলন এবং মনোগ্রাম উন্মোচনের মধ্যদিয়ে শুরু হয় এবাহিনীর নতুন পথচলা। দেশের সীমান্ত নিরাপত্তায় এ বাহিনীর অবদান অপরিসীম!

৭. সুবর্ণ জয়ন্তী পালনঃ
নবগঠিত উদ্যমী বিজিবি এ বছর দেশব্যপী সুবর্ণ জয়ন্তীর বর্ণিল বিজিব দিবস পালন করে। কুমিল্লায়ও বর্ণিল সাজে মধ্যহ্নভোজের মধ্য দিয়ে পালিত হয়। বিজিবি টীমের আন্তরিকতা, শৃংখলা ও সমাদর সবার দৃষ্টি কেড়েছে। ধন্যবাদ, সেক্টর কমান্ডার কর্নেল আবুল হাসনাত শাহরিয়ার ইকবাল, সিও লেফটেনেন্ট কর্নেল মোহাম্মদ ইসহাক, মেজর মোঃ রেজাউর রহমান, এডি মোহাম্মদ পারভেজ শামীম।

বিজিবি বরাবরই কাস্টমসের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন। এ মহতি দিবসের মাহেন্দ্রক্ষণে কুমিল্লা কাস্টমসের পক্ষ থেকে দেশের অন্যতম বৃহত্তম গর্বের বাহিনী বিজিবির সকল সদস্যকে সুবর্ণ জয়ন্তীর বর্ণিল অভিনন্দন ও শুভকামনা!

বিজিবি প্রাক্তন ডিজি মেজর জেনারেল আবুল হোসেনের প্রতি সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা। অবিস্মরণীয় এ ইভেন্টের প্রধান অতিথি, অংশীজন অনুপ্রেরণার আধার জিওসি কুমিল্লা মহোদয়কে আন্তরিক শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।

লেখকঃ কাস্টমস কমিশনার, কাস্টমস এক্সাইজ এন্ড ভ্যাট কমিশনারেট, কুমিল্লা।

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে