জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মেছিলেন এক বনেদি মধ্যবিত্ত পরিবারে। গ্রামের কাদামাটিতে বড় হয়েছেন, ছাত্রজীবনেই আভাস পাওয়া গিয়েছিল রক্তে তার রাজনীতির নেশা। তারপর ধাপে ধাপে অসীম ধৈর্য ও কষ্টের পরীক্ষা দিয়ে উঠে এসেছেন রাজনীতির সর্বোচ্চ শিখরে। পক্ষান্তরে তার কন্যা শেখ হাসিনা উত্তরাধিকার ও জন্মসূত্রে রাজনীতিক। শৈশব থেকেই বাবাকে দেখেছেন জেলজীবন কাটাতে। আর্থিক টানাপড়েনে একজন সাদাসিধে গৃহিণী মায়ের তত্ত্বাবধানে বেড়ে উঠেছেন মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবেশে। বাবার রাজনীতির সুবাদে বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর সহযোগী রাজনৈতিক নেতাদের আনাগোনা ও বিচরণ প্রত্যক্ষ করেছেন, নেতাদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ হয়েছে।

বলতে গেলে গৃহেই বাবার কাছে রাজনীতির হাতেখড়ি। শিক্ষাজীবনে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িত হলেও বিবাহের পর পুরোদস্তুর গৃহিণী বনে যান। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবার শাহাদতবরণ না করলে শেখ হাসিনার রাজনীতিতে আসা ছিল অকল্পনীয়। নিজ মেধা, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বের গুণে তিনিও রাজনীতির সর্বোচ্চ শিখরে আসীন হতে পেরেছেন। তবে তার পথপরিক্রমা মোটেও মসৃণ ছিল না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ মহীয়সী নারীর উত্থানের ঘটনা তাই বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ।

শেখ হাসিনা ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর তদানীন্তন গোপালগঞ্জ মহকুমার পাটগাতী ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের মাত্র দেড় মাস আগে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে পাকিস্তান ও ভারত দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। তার পিতা ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আন্দোলনের একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব, তত্কালীন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর একজন ঘনিষ্ঠ সহচর। জ্যেষ্ঠ সন্তান হাসুর জন্মের সময় তিনি কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা-হাঙ্গামা দমনে ব্যস্ত। দাদা শেখ লুত্ফর রহমান তখন ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত চাকুরে। শেখ হাসিনার শৈশব কেটেছে মধুমতী নদীবিধৌত গ্রামের গৃহস্থ পরিবারে। পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ওই বছরই কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করে নবসৃষ্ট পাকিস্তানে ফিরে আসেন।

পাকিস্তানের জন্মের পর থেকেই পূর্ব বাংলার প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যমূলক নীতি ও আধিপত্য শেখ মুজিবকে ভীষণ ভাবিয়ে তোলে। ফলে ১৯৪৮ সাল থেকেই তিনি পূর্ব বাংলার জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। তাকে বারবার জেলে যেতে হয়। শেখ হাসিনা ও ভাই-বোনেরা বাবাকে খুব একটা কাছে পেতেন না। জেলখানায় গিয়ে বাবার সঙ্গে দেখা করলে শেখ মুজিব সন্তানদের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করতেন।

১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। শেখ মুজিব ওই সরকারের একজন মন্ত্রী হলে তার পরিবার ঢাকায় চলে আসে। শেখ হাসিনার বয়স তখন আট বছর। শেখ হাসিনা ও শেখ কামাল স্কুলে ভর্তি হন। কিছুদিন মন্ত্রী হিসেবে সরকারি বাসায় থাকলেও ক্ষণস্থায়ী যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতনের পর সরকারি বাড়ি ছেড়ে দিতে হয়। ১৯৫৬ সালে আবার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হলে শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পান। শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার মিন্টো রোডের ৩ নম্বর বাড়িতে ওঠেন। কিন্তু ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনে শেখ মুজিবুর রহমান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত হন। তাকে আবার গ্রেফতার করা হয়। তার পরিবার-পরিজনের জীবনও বিপর্যস্ত হয়। আবারো শেখ মুজিবের পরিবার সরকারি বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়। বেগম মুজিব অতিকষ্টে ছেলেমেয়েদের নিয়ে বিভিন্ন ভাড়া বাড়িতে অবস্থান করতে থাকেন। শেখ হাসিনা প্রথমে লক্ষ্মীবাজারের নারী শিক্ষা মন্দিরে পড়ালেখা করলেও পরবর্তী সময়ে আজিমপুর গার্লস স্কুলে অধ্যয়ন করে এসএসসি পাস করেন এবং ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ইডেন কলেজে পড়া অবস্থায় সক্রিয় ছাত্ররাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে শেখ হাসিনা ছাত্র সংসদের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯৬৮ সালে ওই কলেজ থেকে বিএ পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে এমএ ক্লাসে ভর্তি হন। এ সময় পরমাণুবিজ্ঞানী ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে শেখ হাসিনার বিয়ে হয়। ষাটের দশকের শেষদিকে বাবা যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হয়ে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি তখন রাজনৈতিক কার্যকলাপ ও নীতিনির্ধারণী বিষয়ে মায়ের পাশাপাশি শেখ হাসিনাও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা পালন করেন। ওই সময় সংঘটিত গণআন্দোলনেও তিনি ও শেখ কামাল সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালের মার্চের উত্তাল দিনগুলোতেও বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে বেগম মুজিব ও শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধুকে নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করেন। একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় সন্তানসম্ভবা শেখ হাসিনা একটি বাড়িতে অন্তরীণ অবস্থায় নানা অনিশ্চতায় দিন কাটান। বাবা পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি, দুই ভাই শেখ কামাল ও শেখ জামাল মুক্তিযুদ্ধে এবং মা ও ছোট ভাই রাসেল ও বোন রেহানা তারই মতো একটি বাড়িতে অন্তরীণ। ১৯৭১ সালের মে মাসে ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্ম। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে ফের অমানিশার দিনগুলো শেষ হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন দেশে ফিরে এসে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় বিশাল সৈন্যবাহিনী ফেরত প্রদান করেন। এক বছরের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ সংবিধান রচনা করেন। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের ধকল কাটিয়ে দেশ যখন অগ্রগতির পথে ধাবমান, তখনই ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যা করে।

১৯৭৫ সালের ৩০ জুলাই শেখ হাসিনা দুই সন্তান ও ছোট বোন রেহানাকে নিয়ে স্বামীর কর্মস্থল জার্মানিতে বেড়াতে যান। ১৫ আগস্ট প্রত্যূষে যখন বাবা-মা ও ভাইদেরসহ কয়েকজন নিকটাত্মীয়কে ঘাতকরা হত্যা করে খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে ক্ষমতা দখল করে তখন স্বামী-সন্তান ও ছোট বোনকে নিয়ে শেখ হাসিনা ব্রাসেলসে রাষ্ট্রদূতের বাসায় অবস্থান করছেন।

দুঃখ, ভয় ও শঙ্কার মধ্যে জার্মানিতে ফিরে এসে কিছুদিন অবস্থান করে ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে ২৫ আগস্ট সেখানে চলে যান।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তার দল আওয়ামী লীগ নানা ঘাত-প্রতিঘাতে, ঐক্য-অনৈক্যের মধ্যে ধুঁকে ধুঁকে টিকে থাকে। আওয়ামী লীগে ঐক্য ফিরিয়ে আনা এবং পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে তত্কালীন নেতারা ফেব্রুয়ারি ১৯৮১-এর কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ হাসিনাকে দলীয় সভাপতি পদে মনোনীত করেন। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী দল আওয়ামী লীগের তখন বড় দুর্দিন। তাদের একজন নির্ভরযোগ্য কাণ্ডারির প্রয়োজন। এ রকম পরিবেশে ১৭ মে ১৯৮১ শেখ হাসিনা দীর্ঘ ছয় বছর বিদেশে পলাতক ও নির্বাসিত থেকে পিতৃমাতৃহীন নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে প্রত্যাবর্তন করলে যেরূপ লাখ লাখ মানুষ তাকে সংবর্ধনার জন্য সমবেত হয়, শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে ঢাকায় অবতরণ করলে মানিক মিয়া এভিনিউতে লাখ লাখ মানুষ তাকে সাদরে গ্রহণ করে। ৩০ মে তত্কালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান নিহত হলে ১৯৮২ সালে জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন। শেখ হাসিনা দলকে সংগঠিত করার পাশাপাশি দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন ও সংগ্রাম চালিয়ে যান। বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষকে যেরূপ ভালোবাসতেন, দেশটাকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন, সেরূপভাবে শেখ হাসিনাও এ দেশের মানুষকে ভালোবাসেন। তিনি ঘোষণা করেন বাবা, মা, ভাইদের ও নিকট আত্মীয়দের হারিয়ে তিনি নিঃস্ব। তার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। তার একমাত্র কামনা হচ্ছে দেশের সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন। তিনি দেশের জনগণের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করতে চান। রাষ্ট্রপতি এরশাদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে তিনি ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু স্বৈরাচারী এরশাদ ভোট ডাকাতি করে আওয়ামী লীগের অবশ্যম্ভাবী জয় ঠেকিয়ে দেয়। বিরোধী দলে থেকেই শেখ হাসিনা অন্যান্য রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ফলে তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯০-এর ডিসেম্বরে স্বৈরাচারী এরশাদের পতন ঘটে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিশ্চিত বিজয়ের সম্ভাবনা থাকলেও এ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। শেখ হাসিনা বিরোধী দলে থেকেই সারা দেশ গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরে বেড়িয়ে মানুষের দুঃখ-কষ্টে তাদের পাশে দাঁড়ান, অভাব-অভিযোগ শোনেন। ফলে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে কোন এলাকায় কী কী প্রয়োজন সে সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করেন। বিএনপি শাসনামলে মাগুরা উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের আন্দোলন জোরদার হয়। অবশেষে দীর্ঘ ২১ বছর পর জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে এবং শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন।

শেখ হাসিনার চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হলো দুঃখ-কষ্ট, বেদনা ও বিপদের মধ্যেও তিনি অপরিসীম ধৈর্য ধারণের শক্তি রাখেন এবং দৃঢ়চিত্তে সবকিছু মোকাবেলা করেন। শেখ হাসিনার প্রথম (১৯৯৬-২০০১) মেয়াদের প্রধানমন্ত্রীত্বের সময়ে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানির হিস্যা পাওয়ার জন্য ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। জাতীয় সংসদ কর্তৃক ইনডেমনিটি অ্যাক্ট বাতিল করার ফলে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা ও জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচারের পথ সুগম হয়। এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ফলে শান্তি বাহিনীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও বিরোধের নিষ্পত্তি হয় এবং শান্তি বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।

২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে এবং খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হন এবং জননেত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতার ভূমিকায় ফিরে আসেন। ২০০৪ সালে শেখ হাসিনার জনসভায় সংঘবদ্ধ গ্রেনেড হামলা হয়। এতে বহু নেতাকর্মী হতাহত হন। শেখ হাসিনা অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যান।

২০০৬ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা ও সংঘাতের জের ধরে ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে এবং ফখরুদ্দীন আহমদ প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এ সরকারের দুই বছর মেয়াদের শেষদিকে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করে এবং শেখ হাসিনা ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি সরকার গঠন করেন। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার প্রাক্কালে ২০০৮ সালের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে দিনবদলের রূপকল্প ২০২১ ঘোষণা করেন, যা বাস্তবায়ন হলে এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করে তৃতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা চতুর্থ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন।

শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদকালে ১৯৯৮ সালে ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ যমুনা বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণ সমাপ্ত হয় এবং তা যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়। এ সেতুর নির্মাণের ফলে উত্তরবঙ্গের সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রামের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ফলে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। যমুনা সেতুর সাফল্যের পর পদ্মা নদীতে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। ১৯৯৯ সালে একটি প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতুর পরিকল্পনা প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য জাপান সরকারের অর্থায়নের জন্য পত্র প্রেরণ করা হয়। জাপান সরকার এ প্রস্তাবে সম্মত হয়ে ১৮ জুন ২০০১ বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে নোট ভারবাল স্বাক্ষর করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার প্রথম মেয়াদের শেষদিকে ৪ জুলাই ২০০১ মাওয়ায় সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

দ্বিতীয় মেয়াদে ৬ জানুয়ারি ২০০৯ সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করে কাজ এগিয়ে নেয়ার নির্দেশ দেন। তদনুযায়ী যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগ সর্বাত্মক প্রস্তুতি ও ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু অর্থায়নকারী বিদেশী সংস্থাগুলোর সমন্বয়ক বিশ্বব্যাংক ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকল্পে তথাকথিত দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে কাজ স্থগিত করে দেয় এবং ২০১২ সালের জুনে ঋণচুক্তি বাতিল করে। বহু দেনদরবার, টানাপড়েন, দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত ইত্যাদি সত্ত্বেও বিশ্বব্যাংক অর্থায়নে ফিরে না আসায় প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বাস্তবায়ন শুরু করেন। বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অপবাদ সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী মেনে নেননি। বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি পদ্মা সেতু প্রকল্প নিজেদের টাকায় বাস্তবায়ন করেন। প্রধানমন্ত্রীর আত্মবিশ্বাস ও সাহসী সিদ্ধান্তে নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান। প্রধানমন্ত্রীর আত্মমর্যাদাশীল, দৃঢ়চেতা ও সাহসী রাষ্ট্রনায়কোচিত সিদ্ধান্তের ফলে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের সক্ষমতা প্রমাণিত হয়েছে এবং মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার রূপকল্প-২০২১-এর মূল লক্ষ্য এরই মধ্যে অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের পর্যায় থেকে উন্নয়নশীল মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। নিয়মানুযায়ী বাংলাদেশ ২০২৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি গ্রুপ থেকে বেরিয়ে আসবে।

বিগত ২০০৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কৃষির আধুনিকায়ন, শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, ভোগ-চাহিদার প্রসার এবং ক্রমান্বয়ে বৃহৎ শিল্প ও সার্ভিস সেক্টরের ব্যাপক প্রসারের ফলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পাশাপাশি দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের শিল্পোদ্যোগ ও জনগণের শক্তির সঙ্গে সরকারের সময়োপযোগী নীতিসহায়তা ও শুল্ককর ছাড় এবং রফতানি বাণিজ্যের সুবিধা দেশের শিল্পোন্নয়ন ত্বরান্বিত করে। বর্তমানে জিডিপিতে শিল্পের অবদান প্রায় ৩৫ শতাংশ।

বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭৩ সালে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। ২০২০ সাল পর্যন্ত সাতটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়। ২০২১ সালে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। দেশে আর্থিক শৃঙ্খলা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসা-বাণিজ্য সচল থাকা এবং উৎপাদন, সরবরাহ ও ভোগ ব্যবস্থার ক্রমপ্রসারের ফলে জাতীয় আয় বাড়তে থাকে। ২০০৯-২১ পর্যন্ত জিডিপি প্রবৃদ্ধির গড় ৭ শতাংশের ঊর্ধ্বে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ২৫ শতাংশে পৌঁছে। করোনা মহামারীর ফলে পরবর্তী দুই বছর অবশ্য প্রবৃদ্ধি হ্রাস পায়। ২০১৯ সালে দারিদ্র্যের হার ২৪ শতাংশ এবং অতিদারিদ্র্যের হার ১১ শতাংশে নেমে আসে।

কৃষির আধুনিকায়ন, সারের ব্যবহার, নতুন উদ্ভাবন এবং সর্বোপরি প্রতি বছর প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা সরকার ভর্তুকি দেয়ার ফলে শস্য উৎপাদন, শাকসবজি ও মাছ উৎপাদনে দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে।

২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। ২০০৪-০৫ সালে যেখানে দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল সাড়ে চার হাজার মেগাাওয়াট, সেখানে ২০২০ সালে দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমান সরকারের বড় সাফল্য অবকাঠামো উন্নয়ন। এ পর্যন্ত অসংখ্য রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, হাইওয়ে ইত্যাদি স্থাপিত হয়েছে।

বর্তমানে দেশে অন্তত ১০-১২টি মেগা প্রকল্প চলমান রয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, কর্ণফুলী টানেল ও ঢাকা বিমানবন্দর থেকে যাত্রাবাড়ীর অদূরে কুতুবখালী পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ২০২২ সাল নাগাদ চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পায়রা সমুদ্রবন্দর, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ আরো কয়েকটি বড় প্রকল্প তিন-চার বছরের মধ্যে সমাপ্ত হলে দেশের অগ্রগতিতে নতুন মাত্রা যোগ হবে। এ বছর দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ২ হাজার ২২৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। নানা সামাজিক সূচক যেমন শিশুমৃত্যু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস, গড় আয়ু, শিক্ষার হার, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার প্রভৃতিতে বাংলাদেশের অগ্রগতি সন্তোষজনক এবং ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বেশি।

প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে এ সরকারের আগ্রহ, সাহস ও সদিচ্ছা প্রশংসনীয়। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে প্রতি সপ্তাহে একদিন করে নিয়মিত মন্ত্রিসভা ও একনেক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, কৃষি, পরিবহন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী সংরক্ষণবিষয়ক যেকোনো প্রকল্প দেশের কোন এলাকায় বা কোথায় নেয়া প্রয়োজন তা প্রধানমন্ত্রীর নখদর্পণে। কারণ তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও আনাচকানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন। দেশের স্বার্থে প্রকল্প গ্রহণে সরকারের অর্থাভাব হয় না। গত এক যুগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের উন্নয়ন সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং ধারাবাহিক দেশ পরিচালনার ফলে। তার দেশপ্রেম ও মানুষের কল্যাণে কাজ করার মানসিকতা তিনি পিতার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন।

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে বাংলাদেশ বেশ সাফল্য অর্জন করেছে। করোনাকালে প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ডিজিটাল মাধ্যমে বেশির ভাগ কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উেক্ষপণের ফলে ইন্টারনেট সেবা প্রদান সহজ হয়েছে। দেশে বর্তমানে প্রায় ১৭ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহার হয়। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১১ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। প্রতি ইউনিয়নে ইউনিয়ন তথ্য সেবাকেন্দ্র থেকে গ্রাহকদের ডিজিটাল সেবা প্রদান করা হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু প্রবর্তিত বৈদেশিক নীতি—সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়—মূলমন্ত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও অনুসরণ করেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নারীর ক্ষমতায়ন, বিশ্বসম্পদের সমবণ্টন, দারিদ্র্য হ্রাস প্রভৃতি বিষয়ে শেখ হাসিনার বক্তব্য ও চিন্তাধারা সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছে। এমডিজি (২০০০-২০১৫) ও এসডিজি (২০১৫-৩০) বাস্তবায়নে বাংলাদেশের আগ্রহ ও সাফল্যের কারণে শেখ হাসিনা দেশ-বিদেশে একজন ‘ডায়নামিক’, ‘ভিশনারি’ ও ‘প্রেরণাদায়ী’ নেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সাম্প্রতিক কভিড-১৯ মোকাবেলায় বাংলাদেশের সাফল্য এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য তার গৃহীত পদক্ষেপ সর্বত্র প্রশংসিত হচ্ছে।

মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত বাস্তুচ্যুত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তাদের শান্তিপূর্ণভাবে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর সব প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এজন্য শেখ হাসিনাকে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে অর্থসামাজিক খাতে বাংলাদেশের বিস্ময়কর উত্থান ও অগ্রযাত্রা এখন সারা বিশ্বে স্বীকৃত। প্রভাবশালী ম্যাগাজিন দি ইকোনমিস্টের ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬৬টি উদীয়মান সবল অর্থনীতির দেশের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান নবম। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৪তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। প্রধানমন্ত্রীর ‘রূপকল্প ২০৪১’-এর লক্ষ্য হলো ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশে পরিণত হওয়া। সে লক্ষ্যে পরিকল্পিত উপায়ে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ স্বাধীন করেছেন, কিন্তু মাত্র সাড়ে তিন বছর দেশ শাসন করে তিনি যখন দেশকে অগ্রগতির পথে, দুর্নীতিমুক্ত সোনার বাংলা গড়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন তখন একদল ষড়যন্ত্রকারী ঘাতক তাকে সপরিবার হত্যা করে।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত কাজ করে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারই সুযোগ্য কন্যা নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি জাতীয় নেত্রী থেকে বিশ্বনেত্রীতে পরিণত হয়েছেন। এ পর্যন্ত ৪০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ডিগ্রি, পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেছেন।

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ জননেত্রী শেখ হাসিনার ৭৫তম জন্মদিবস। আজ তিনি ৭৪ বছর বয়স পূর্ণ করে ৭৫ বছরে পদার্পণ করলেন। জন্মদিনে তার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। তিনি যাতে সুস্থ শরীরে সামর্থ্যের সঙ্গে আরো বেশ কিছুকাল দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করতে পারেন, পরম করুণাময় আল্লাহর কাছে তার জন্মদিনে এই আমাদের প্রার্থনা।

লেখক: বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান; বর্তমান জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে