মোহাম্মদ বেলাল হোসাইন চৌধুরী: সাধারণ সারি থেকে সময়ের অসাধারণ উপমা হতে সবাই পারেন না! অসীম ত্যাগ, ধৈর্য্য, শ্রম, মেধা, নিয়ত সাধনা দিয়ে বিরলরা পারেন। আজ এমন একজনের স্মরণে লিখিছি। নিজের ও সরকারের দরকারে বহুবার এ অগ্রজের সান্নিধ্যে আমি কৃতার্থ। তাঁকে যতো দেখেছি, শিখেছি। আইনের ছাত্র বলেই আমার প্রতি অনুজতুল্য সহজাত আনুকূল্য ও পারস্পর্য পয়মন্ত ছিল। সময়ের প্রবাহে তিন কেবল ঋদ্ধ, শাণিত, বর্ণিল অগ্রণী হয়েছেন। প্রতিদিন নিজেকে ছাড়িয়েছেন।

গত ৮অক্টোবর ২০২০ আমার এ অগ্রজ ইতিহাস গড়লেন। দেশের আইন জগতের প্রধান নির্বাহী হলেন। রাষ্ট্রের ষোড়শ অ্যাটর্নী জেনারেল হিসেবে মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিয়োগ পেলেন। আইন শিক্ষাণবীশদের অনুপ্রেরণার নতুন গল্প হলেন। এ এম আমিন উদ্দিন জীবনচরিতে আরেকটি জয় যোগ করলেন।

আমার দেখা তিনি এক রুপকথার আইন-নায়ক! দু’দশকের বেশী আমার স্মৃতির ভান্ডার অসীম ঋদ্ধ। পরিশ্রমের সাথে দেশপ্রম, সততা, নিষ্ঠা, একাগ্রতার নিপুন আধার। অনুজ হিসেবে তাঁর পক্ষপাতদুষ্ট ভালোবাসায আমি ঋদ্ধ।

সাধ, সাধ্য, সাধনার সাথে কর্মবীরত্ব। নিরহংকার, নিরাবেগ, নিরুত্তাপ, অসীম সংকটেও সহাস্য, সহজগম্য, সদালাপী, সুহৃদ, সহানুভব। নিস্পৃহ, নিরুপায়, উদ্বিগ্ন, অসহায় মানুষের আস্থার আশ্রয়। চেনাজানার বাইরে অচেনাদের জন্যেও।

১৯৯৯ সালে তাঁর সাথে প্রথম দেখা! বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের নির্ভরতার বন্ধু ও সতীর্থ বিএম ইলিয়াছ কচি একজন সে সময়ের এএজির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। দারুণ এক অভ্যর্থনা দিয়ে শুরু। অকাতরে অদ্যাবধি তাঁর কাছ থেকে পেয়েছি। দেড় বছর আগেও অবমাননা মামলায় বেনাপোলের কমিশনারের ব্যক্তিগত মামলা শুনানী করে বললেন, ‘ও কিসের টাকা দেবে! ওতো ছোট ভাই”— ঢাকা, চট্টগ্রাম থেকে বেনাপোল– এমন বহুবার হয়েছে।

তাঁর সাথে বড় ঘটনাটি বলাই হয়নি! সময়টা ১৯৯৯ সাল। এক মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ চাকরিচ্যুতির রায় দেয় অবস্থা। আমি তখন ঢাকা কাস্টম হাউসে এসি(বন্ড)। বন্ডের কাঁচামাল বাইরে বিক্রি করা এক শক্তিমান চক্রের মিথ্যা মামলার প্রতিপক্ষ! আমিন ভাই সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল। বর্তমান মাননীয় প্রধান বিচারপতি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল। মরহুম শ্রদ্ধেয় মাহমুদুল ইসলাম স্যার অ্যাটর্নি জেনারেল। মরহুম মাননীয় বিচারপতি বজলুর রহমান (ছানা ভাই) ডিএজি। আমি তাঁদের স্নেহধন্য ছিলাম। সবাই সুপ্রিম কোর্টের পুরনো ভবনের ওপরে বসতেন।

গুরুতর অনিয়মের জন্য ১৯৯৯সালে বন্ডের ৯২টি লাইসেন্স বাতিল হয়। তখন ঢাকার বেশীরভাগ বন্ড প্রতিষ্ঠান কাস্টম হাউসের অধীনে। কমিশনার এগুলো বাতিল করলেও এসি(বন্ড) হিসেবে দায় চাপে আমার ওপর। সরকারী কাজ করতে গিয়ে চক্রের জিঘাংসার শিকার! চক্রের দায়েরী এক রীট মামলায় বিরাট অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে। বিপক্ষে কৌঁসুলি মরহুম বারিস্টার মওদুদ আহমদ। বেশ ক’দিন শুনানী হলো। তিনি স্বভাবসুলভ সুবক্তৃতায় আমাকে দোষী প্রমাণের সকল বন্দোবস্ত করলেন। নবীন আইনজ্ঞ বন্ধু কচি আমার জন্য টেনশন নিয়ে প্রতিদিন ওই বেঞ্চে শুনানীতে যায়। ও আমাকে দ্বিতীয়বার নিয়ে গেল আমিন ভাইয়ের অফিসে। জীবনে প্রথম এমন পরিস্থিতিতে পড়ে আমি ব্যাপক দ্বিধাদ্বন্দ্বে! তিনি কিভাবে নেন, আমাকে ভুল বোঝেন কি-না!

বাদীর চ্যালেঞ্জ আমার চাকরি খেতে হবে, টাকা যতো লাগুক দেবে। বিপক্ষের ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ আদালতে ওদের এজেন্ডা নিয়ে ব্রত। তিনি আদালতকে প্রায় বুঝিয়ে ফেলেন ‘কেন এ অফিসারকে চাকরিচ্যুত হতে হবে’।

বেঞ্চে ছিলেন মাননীয় সিনিয়র বিচারপতি ও পরে মাননীয় প্রধান বিচারপতি ফজলুল করিম ও আব্দুল ওয়াহাব মিয়া। আমিন ভাই মাননীয় অ্যাটর্নি জেনারেলকে বারিস্টার মওদুদ আহমদের বিপক্ষে শুনানীতে নিয়ে গেলেন। আদালত যেন ক্রমেই বাদীর দিক ঝুঁকছিল। কচি সব কাজ ফেলে ওই কোর্টে বসে আছে। ওকে এবার বেশী আতংকিত মনে হচ্ছিল। আমাকে সান্ত্বনা দিলেও আমি আমিন ভাইয়ের চোখে মুখে উদ্বেগ স্পষ্ট!

শুনানীর শেষ দিন! ক্ষুব্ধ আমিন ভাই কোর্ট থেকে ফিরে বললেন, আগে রায় হোক। প্রয়োজনে আমরা আপীল করবেন। তাঁর মুখে এ কথার মানে আমরা বুঝে নিলাম। কি বলব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ভাবছিলাম রায় হয়তো হয়ে গেছে। আমাকে বলতে চান না তিনি।

রায় হবার দুদিন আগের কথা। সুপ্রিম কোর্টে ঘুরছি এদিক ওদিক। বিমর্ষ সময় কাটছে আমাদের। কচিকে বললাম, কোর্ট কি ওদের যুক্তি গ্রহণ করেছে? এটা কিভাবে সম্ভব! আমাকে দোষী মানছে। চাকরি যাবে, আমরা ন্যায়ের যুদ্ধে হারব। ওরা চ্যালেঞ্জে জয়ী হবে। বিষণ্ণ সংক্ষুব্ধ মনে দু’বন্ধু বাসায় ফিরলাম। উদ্বেগ, উৎকন্ঠায় রুদ্ধশ্বাস এক রাত পার করলাম।

পরদিন আমাকে কচির জরুরী তলব। ছুটে গেলাম সুপ্রিম কোর্ট ভবনে। অ্যাটর্নী জেনারেল অফিস থেকে কচি আসার অপেক্ষা ও উৎকন্ঠায় সময় কাটছে। “আমিন ভাইতো বিশাল কাজ করে ফেলেছেন। তোমাকে বলতে নিষেধ করেছেন।” গত কদিনের টেনশন নেই– কচি স্মিত হাসছে। অবিশ্বাস নিয়ে ওর দিকে বেশ কতোক্ষণ তাকিয়েছিলাম। তখনো বুঝিনি আমিন ভাই একটা ট্রাম্পকার্ড রিজার্ভ রেখেছেন!

জানতে পারলাম, তিনি পরদিন বেঞ্চের একজন মাননীয় বিচারপতির খাস কামরায় গিয়েছিলেন। কী বলেছিলেন জানি না! দু’দিন পর সরকারের পক্ষে রায় ঘোষণা হলো। সে যাত্রায় চাকরি বাঁচায় আমি যতটুকু বিস্মিত হয়েছি, তার চেয়ে বেশী বিস্মিত হয়েছিলে মরহুম ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। খুউব বিরক্ত হয়েছিলেন তিনি। আপীল করবেল বলেও পরে আর করেননি।

একটি বাক্য হতাশার সেদিনে আমাকে প্রচন্ড দম দিয়েছিল! ‘চাকরি না থাকলে প্র্যাকটিস করব’ শুনানীর শেষ দিনে উদ্বিগ্ন আমি আমিন ভাইকে বলেছিলাম। তাঁর বলা বাক্যটি! এখনো কানে বাজে…. আমার পিঠে হাত রেখে পরম বাৎসল্যে তিনি বলেছিলেন, ‘আরে ধুর, আল্লাহ ভরসা, আমি আছি না!’ সেদিন আমার জন্য অনেক বড় দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি, তখন বুঝিনি, পরে বুঝেছি। চাইলেও অনেকে এমন করে পারেন না! দায়িত্বময় সে ভালোবাসা আমাকে আজো দায়িত্ব নিতে প্রেরণা দেয়!

দরিদ্র বিচার প্রার্থী, জুনিয়রের মামলায় ফিস না চাওয়ার বহু ঘটনায় সমৃদ্ধ তাঁর পেশাগত জীবন।

আজ গেল এ মহতি পরার্থে অন্তপ্রাণ মানুষটির জীবনের সেরা দিন! বড় হৃদয়ের বড় মানুষ, বড় অভিভাবক, প্রিয় অগ্রজ, দেশর সফলতম আইনজীবী, রাষ্ট্রের অন্যতম বয়োকনিষ্ঠ অ্যাটর্নী জেনারেলের শুভ জ্ন্মদিন !

সশ্রদ্ধ শুভকামনা আইন শিক্ষাণবীশদের আইকন এ এম আমিন উদ্দিন আমিন উদ্দিন। আল্লাহ আপনাকে আরো খ্যাতিমান করুন! সুস্বাস্থ্যে দীর্ঘজীবন হোন!

লেখক: কমিশনার, কাস্টমস, এক্সাইজ অ্যান্ড ভ্যাট কমিশনারেট-কুমিল্লা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে