রাসেল হোসেন, মিরপুর প্রতিনিধি: রাজধানীর মিরপুরের টেকনিক্যাল মোড় এলাকায় ট্রাকের চাপায় অভিনেত্রী আশা চৌধুরীর মৃত্যুর ঘটনায় নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় মঙ্গলবার (৫ জানুয়ারি) রাত ১০টার পরে দারুস সালাম থানায় আশার বাবা আবু কালাম বাদী হয়ে আশাকে বহনকারী মোটরসাইকেলটির চালক ও অজ্ঞাতপরিচয় ট্রাকচালকসহ কয়েকজনকে আসামি করে মামলাটি করেছে। মঙ্গলবার রাতে মামলা দায়েরের পর শামীম আহমেদ নামের সেই মোটরসাইকেলচালককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আশার মৃত্যুর পেছনে তাঁর ‘ভূমিকা’ থাকতে পারে বলে সন্দেহ স্বজনদের।

বুধবার (৬ জানুয়ারি) শামীম আহমেদকে আদালতে হাজির করে পুলিশ। ঢাকা মহানগর হাকিম মোর্শেদ আল মামুন ভূঁইয়ার আদালত তাঁর জামিন আবেদন খারিজ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এ মামলার এজাহার আদালতে পৌঁছালে বিচারক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেন।

স্বজনরা জানান, বনানী থেকে কালশী রোড হয়ে মিরপুর রূপনগর আবাসিক এলাকায় নিজের বাসায় ফেরার কথা ছিল আশার। সোমবার রাত ১১টার দিকে আশা তাঁর মাকে ফোন দিয়ে জানান, তিনি বনানীতে আছেন। ২০ মিনিটের মধ্যে তিনি বাসায় ফিরবেন। আশার বাবা আবু কালাম বলেন, ফোন করার পাঁচ মিনিট পরে তিনিও আশাকে ফোন দেন। সেই সময় মেয়ের সঙ্গে তাঁদের বোর্ডবাজার এলাকার নতুন বাসার কাজের ব্যাপারে সর্বশেষ কথা হয়। আশার মা-বাবা ধরে নিয়েছিলেন মেয়ে বাসায় ফিরতে হয়তো সাড়ে ১১টা বাজতে পারে। পরে রাত দুটার দিকে আশাকে বহনকারী মোটরবাইক চালক শামীম তার মাকে ফোন দিয়ে টেকনিক্যাল মোড়ে আসতে বলেন। তার কিছুক্ষণ পর শামীম আবার তার মাকে ফোন করে বলেন আশা আর নেই, মারা গেছেন।

স্বজনরা জানান, মোটরবাইক চালক পুলিশকে তিন রকমের কথা বলেছেন। আশার ফেরার কথা ছিল কালশী হয়ে তাহলে তারা কিভাবে টেকনিক্যাল মোড়ে গেলেন? তার পরিবারের পক্ষ থেকে এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে মোটরবাইক চালক শামীম জানান যে তিনি পথ ভুলে গেছিলেন। কিন্তু তার মামা দুলাল জানান, আশা ঢাকার প্রায়ই সব রাস্তা চেনে, তাহলে পথ ভুল হয় কিভাবে?

আশার মামা দুলাল আরও জানান, শামীম পুলিশের সামনে বলছে রাস্তা পার হতে গিয়ে আশা দুর্ঘটনায় মারা গেছে। কিন্তু ক্যামেরার ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে মোটরবাইকে থাকা অবস্থায় ট্রাকের ধাক্কায় আশা রাস্তায় পড়ে যান তারপর তার মাথার উপর দিয়ে ট্রাকটি চলে যায়। আশাকে নেশা জাতীয় কিছু খাইয়েছে মোটরবাইক চালক শামীম। তা নাহলে আশা সুস্থ থাকলে তাকে শক্ত করে ধরত। আশা যখন বাইক থেকে ছিটকে পড়ে যায় তখন সে একবারও আশাকে ধরেনি। আর শামীম আড়াই ঘণ্টা রাস্তায় কিভাবে ঘুরেছে তার কোন সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। সে কারণে শামীমকে প্রধান আসামি ও ট্রাকচালককে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করেছি।

দারুস সালাম থানার ওসি তোফায়েল আহমেদ বলেন, মঙ্গলবার রাতেই আশার বাবা আবু কালাম বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন। মামলায় মোটরসাইকেলের চালক শামীম আহমেদকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অভিযুক্ত শামীম আহমেদ অভিনেত্রী আশার পরিবারের ছয় থেকে সাত বছরের পরিচিত। তাঁকে সন্দেহ হওয়া পরিবার শামীমসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরো চারজনকে আসামি করেছে সড়ক আইনের ১০৫ ধারায় । ট্রাকটি শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি ।

উল্লেখ্য,সোমবার (৪ জানুয়ারি) মধ্যরাতে রাজধানীর দারুস সালাম এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় সময় আশাদের পেছনে থাকা গাড়িতে বসানো ক্যামেরার একটি ফুটেজ গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, শ্যামলীর দিক থেকে আসা মোটরসাইকেলটি টেকনিক্যাল মোড়ে মিরপুর ১-এর দিকে যেতে সিগন্যালে একটি ছোট ট্রাকের পেছনে দাঁড়ায়। এ সময় পেছন থেকে একটি বড় ট্রাক সোজা এসে একটু ঘুরিয়ে গাবতলীর দিকে চলে যায়। সেই ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মোটরসাইকেল নিয়ে ডান দিকে পড়ে যান শামীম। এ সময় মোটরসাইকেল থেকে আশা কিভাবে পড়ে গেলেন তা ফুটেজে স্পষ্ট নয়। তবে সামনের অংশের ধাক্কায় তিনি কিছুদূর ছিটকে যান এবং তাঁকে চাপা দিয়ে যায় ট্রাকটি। এতে ট্রাকটি বেপরোয়া চালিয়ে নিজ লেন থেকে ঘুরে অতিক্রম করে আশাকে চাপা দিয়েছে বলে স্পষ্ট দেখা গেছে। তবে আশা মোটরসাইকেল থেকে নেমেছেন বা পড়ে গেছেন, নাকি ধাক্কা দিয়ে তাঁকে টেনে নেওয়া হয়েছে তা পেছনের ফুটেজে স্পষ্ট নয়।

চার বোনের মধ্যে নিহত আশা চৌধুরী সবার বড়। রাজধানীর বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজিতে (বিইউবিটি) আইন বিভাগে সপ্তম সেমিস্টারে পড়াশোনা করতেন তিনি। প্রায় চার বছর আগে তিনি অভিনয়জগতে আসেন। একাধিক একক নাটক, টেলিফিল্ম, ধারাবাহিক নাটক , অনুষ্ঠান উপস্থাপনা ছাড়াও তিনি বিজ্ঞাপন ও গানের মডেল হয়েছেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে