কাজী ওয়াজেদ আলী: ২০১৮ সাল, ভাগ্নের বিয়েতে সপরিবারে ছুটিতে গেলাম খুলনায়। ভাগ্নে হলেও নিজের সন্তানের মতোই। খুলনা শহরের একই জায়গায় বাসা, ছোট থেকেই একসাথে বসবাস।

গ্রামের বাড়ি থেকে অনেক লোকজন এসেছে বিয়ে বাড়িতে। তাই ভাবলাম পরিবার নিয়ে একটু হোটেলে থাকি। কিন্তু বাধ সাধলো আমার মা। বললো, একটু কষ্ট করে সবাই এখানেই থাক, হোটেলে যাস না। আমার স্ত্রী বলল মা, সারাদিন তো বাসাতেই থাকব, শুধু রাত টুকু হোটেলে কাটাবো। মায়ের কথা না শুনে উঠলাম শহরের একটি হোটেলে।

ডাবল বেডের রুম, নিচে এক্সট্রা বেডে আমাদের কর্ম সহায়িকা। এক বেডে আমার স্ত্রী আর বড় মেয়ে এবং আরেক বেডে আমি আর আমার ছোট মেয়েটা। কারণ মেয়েগুলো বড় হলেও হোটেলের আলাদা রুমে থাকার মত সাহস তখনও তাদের হয়নি।

রাত তখন তিনটা। হঠাৎ আমার স্ত্রীর চিৎকার বাঁচাও! বাঁচাও! তাৎক্ষণিক আমার ঘুম ভেঙে গেলো, আমি উঠে বিছানায় বসে পড়লাম! ভাবলাম হয়তো হোটেলে ডাকাত ঢুকেছে! তাকিয়ে দেখি আমার স্ত্রী বাথরুমের দিকে দৌঁড়াচ্ছে। কিন্তু নিচে কর্ম সহায়িকা তার পা এমনভাবে ধরে রেখেছে যাতে সে যেতে না পারে। ঠিক যেন কাবাডি খেলার শক্ত সামর্থ রেইডারের মতো! বারবার আমার স্ত্রী পা টানছে, কিন্তু সে কোনক্রমেই পা ছাড়ছেনা। ছোট মেয়েটাকে দেখলাম আমার পাশ থেকে দৌঁড়ে লাফিয়ে পাশের টেবিলের নিচে লুকিয়ে গেল। বড় মেয়েটা খাটের নিচে ঢোকার জন্য প্রাণপন চেষ্টা করছে। কিন্তু আমি ভাবলাম ডাকাত পড়লে তো রুমের দরজা খোলা থাকবে। বললাম, কি হয়েছে? সাথে সাথে আমার স্ত্রী বলল ভূমিকম্প! ভূমিকম্প!

একথা শুনে আমার জানে পানি আসলো, যাক, ডাকাত তো না। বললাম, কই আমিতো টের পাইনি? আমার স্ত্রী জবাব দিলো, ওর খাট কেঁপে উঠেছে! আমি টের পেলাম একটু নড়াচড়া করতেই খাটটা কেমন কেঁপে কেঁপে উঠছে। একটু পরেই আবিষ্কার করলাম হোটেলের খাটগুলো আসলে এমন, একটু নড়াচড়া করলেই কেমন কেঁপে কেঁপে ওঠে ভিতরের ম্যাট্রেসের কারণে। বুঝলাম তার পাশে শুয়ে থাকা আমার মেয়েটি এপাশ থেকে ওপাশ ফেরার সময় ম্যাট্রেসের কারণে বিছানা কেপে ওঠায় সে ভেবেছে ভূমিকম্প হচ্ছে। আর এ কারণেই গভীর রাতে এই চিত্রনাট্য।

কিছুক্ষণ পর সবকিছু পরিস্কার বুঝতে পেরে সবাই হাসাহাসি শুরু করলাম। এবার আমার স্ত্রীর ভয়, সবাই চুপ করো! হোটেল কর্তৃপক্ষ টের পেলে ভাববে ৫ টা পাগল ঢুকেছে হোটেলে। তখন আমাদের হোটেল থেকে বের করে দিবে, এতরাতে যাব কোথায়! এবার আমার মায়ের কথা মনে পড়লো। মায়ের কথা না শুনে ফুটানি করে হোটেলে ওঠার জন্যই এই অবস্থা।

আজ ভোরে বাসায় আবার একই চিত্রনাট্য। তবে এবার আর অনুমানভিত্তিক না। সত্যি সত্যিই ভূমিকম্প হয়েছে। তাই তাৎক্ষণিক বাসার সবাই দরজামুখি। আল্লাহপাক আমাদের এধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ হতে সবাইকে রক্ষা করুন, আমিন।

লেখক: অফিসার ইনচার্জ, পল্লবী থানা, বাংলাদেশ পুলিশ।
(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে