শাখাওয়াত হোসেন মামুনঃ আমরা এখন বৈশ্বিক মহামারীর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। কোভিড কখনো বা বাড়ছে আবার কমছে।আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যবসাটা বলতে গেলে সেটাও কিন্তু বৈশ্বিকভাবে গৃহীত হয়। যদি গার্মেন্টসের কথা বলেন সেটা কিন্তু সম্পূর্ণ রফতানিমূখী। আর লোকাল বিজনেসের কথা যদি বলেন, যেমন খাদ্যসামগ্রী বলেন, আর অন্য কিছু যাই বলেন না কেন, দেশের ভিতরে ব্যবসা হলেও এটার বৈশ্বিক একটা ইস্যু আছে। কারন আমাদের কাঁচামাল বেশিরভাগই দেশের বাহির থেকে আসে। এক্ষেত্রে গতবছরে আমাদের ব্যবসার কোনো গ্রোথ হয়নি, আমরা শুধুমাত্র সার্ভাইভ করে যাচ্ছি। এই দুর্যোগটাকে কাটানোর চেষ্টা করছি। যতটুকু খারাপ আসংকা করেছিলাম, আল্লাহর অশেষ রহমতে ততটা ক্ষতি হয়নি।

ভাইয়া গ্রুপ: ভাইয়া গ্রুপের ইতিহাস হচ্ছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে আমাদের গ্রুপের জন্ম।এর আগেও আমাদের ব্যবসা ছিল। আমার দাদা ব্যবসা শুরু করেছেন। তারপর বাবা ছিলেন। থার্ড জেনারেশন হিসেবে আমি আছি। আমার কাজিন, আমার ভাইয়েরা আছেন।আমাদের ব্যাবসায়িক ভিত্তিটা কিছুটা শক্ত বলতে পারেন। যেহেতু আমাদের মাল্টিপল বিজনেস আছে, সেহেতু একটা খারাপ গেলে আরেকটা দিয়ে পুশিয়ে নেয়া সম্ভব হয়। ইনশাল্লাহ এই দুর্যোগের সময় আমরা ভালো আছি। কিন্তু ২০১৮-১৯ যারা ব্যবসা শুরু করেছেনতাদের জন্য সার্ভাইভ করাটা অনেক কষ্টের। কারণ ব্যবসাটাকে কন্টিনিউ করা, ব্যবসা ধরে রাখা, অনেকের জন্যই আসলে চ্যালেঞ্জ হয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আমি অনেককে জানি ঢাকায় এসে ২০১৮-তে ব্যবসা শুরু করেছেন। কোভিড শুরু হলে চেষ্টা করেছেন, কিন্তু ২০২০এ টিকে থাকতে পারেননি। ঢাকা থেকে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের যে পুঁজি ছিল সেটাও নষ্ট হয়ে গেছে। এখন অনেক স্ট্রাগল করছে। এই জায়গায় আমার পরামর্শ একটাই, ধৈর্য্য ধরতে হবে। ধৈর্য্য ধরা ছাড়া কোনো উপায়ও নেই। ব্যবসাটাকে যতটুকু সম্ভব টিকিয়ে রাখা। আপনি যদি টিকিয়ে রাখতে পারেন, এখন যে টিকে থাকবে, সে কিন্তু ভালো করবেন। কারণ কোভিড এক সময় থাকবে না।

সরকারের করনীয়: সরকারের প্রতি আমরা দাবি করবো- নতুন উদ্যোক্তা যারা, এই সময়েব্যবসা শুরু করেছেন, তাদেরকে নীতিগত সহায়তা দেয়া। আমরা যারা বড় ব্যবসায়ী আছি, ব্যাংক লোন নিয়েছি, তারা কিন্তু কমবেশি প্রণোদনা পেয়েছি। কারণ আমাদের ব্যাংক লোন ছিল। ব্যাংক তার লোনটাকে সিকিউর করার জন্য, সরকারের নীতিমালার আওতায় আমাদেরকে প্রণোদনা দিয়েছে। নতুন উদ্যোক্তারা কিন্তু সেটাও পাইনি। তাদের ব্যাংক লোন ছিল না। তারা সেটা থেকেও বঞ্চিত। আমি এখানে সরকারের যারা নীতিনির্ধারক আছেন, তাদের বলবো, এই ধরনের উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করুন। তাদেরকে নীতিগত সহায়তা দিন। তাদেরকে সাপোর্ট দিন। প্রয়োজনে তাদের ট্যাক্স দুই তিন বছরের জন্য ছাড় দিয়ে দিন। ভ্যাট কমিয়ে দিন। নতুন উদ্যোক্তা যারা ট্রেড লাইসেন্স করেছে ২০১৯-২০ সালে, আমি বলবো তাদের একটু অন্যভাবে দেখার জন্য, সরকারের কাছে আমার অনুরোধ থাকলো।

আমাদের গ্রুপের ব্যবসা: প্রভাতী ইন্সুরেন্স, ফুড, হাউজিং, এডিবল অয়েল এগুলো আমাদের ভাইয়া গ্রুপের বিজনেস প্রতিষ্ঠান। আমাদের ফুড সেক্টর সম্পর্কে একটু বলি। আপনারা জানেন, সব খাবারের দাম এখন কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক সময় বলা হয় কোম্পানিরা ফুডের দাম বাড়াচ্ছে কেন? আপনারা জানেন, আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। যে গম টনপ্রতি ২১৫- ২২০ডলারে কেনা হতো, তা বেড়ে এখন ৩৪০- ৩৫০ ডলার হয়েছে। আমরা কোভিডের আগে যে দরে এডিবল অয়েল কিনেছি, এখন তা ডাবল দাম দিয়ে কিনতে হচ্ছে। চিনির দাম বেড়ে গেছে। আন্তর্জাতিকভাবে প্রোডাকশন কম হচ্ছে। আবহাওয়ার পরিবর্তন, আবার অনেক দেশ খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অনেক প্রোডাক্ট বেশি করে প্রিজার্ভ করছে। এতে করে খাদ্যের দাম বেড়ে গেছে। আমরাও বাধ্য হয়েছি দাম বাড়াতে। ব্যবসা করলে তো আর লস দিয়ে করা যাবে না।

ইন্স্যুরেন্স: আমাদের ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির নাম প্রভাতী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। আল্লার রহমতে ভালো যাচ্ছে। আমরা চেষ্টা করি, আমাদের ক্লায়েন্টদেরকে ঠিক সময়ে ক্লেমটা পরিশোধ করে দিতে। আমাদের কোম্পানি পুজিবাজারে তালিকাভুক্ত। শেয়ার মার্কেটে আমাদের প্রভাতী ইন্স্যুরেন্সের
শেয়ারের দাম ভালো আছে। যেহেতু ক্লায়েন্টরা আমাদেরকে বিশ্বাস করে, তাই বেশি দামে তারা আমাদের শেয়ার কিনে বলে আমার মনে হয়।

আমাদের হাউজিং আছে ভাইয়া গ্রুপের নামেই। আমাদের এডিবল অয়েল আছে, যেটা আমরা এক্সপোর্ট করি। আমাদের রাইস ব্র্যান অয়েল (ধানের কুড়া থেকে তেল) ফ্যাক্টরি আছে। পুরোটাই আমরা এক্সপোর্ট করি। আমাদের বাৎসরিক টার্নওভার প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলারের। এই অয়েলের পুরো কাঁচামাল আমাদের দেশীয়। বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় না। আপনি বলতে পারেন, যেখানে আমরা তেল ইম্পোর্ট করি, সেখানে আপনারা কেন এক্সপোর্ট করেন?

রাইস ব্র্যান অয়েলটা খুব স্বাস্থ্যসম্মত তেল। একটু দামি তেল। আমি বলবো, সবাই আমরা স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাই না। আমরা সাধারণত কম দামি জিনিস পছন্দ করি। বেশি দামি জিনিস এভয়েড করার চেষ্টা করি। এতে করে তেল লোকাল বাজারে যে দামে আসে, সে দামে বিক্রি করা আমাদের পক্ষে কঠিন হয়ে যায়। তাই আমরা ইন্ডিয়া, ইউরোপ, জাপানে আমাদের এডিবল অয়েল ও রাইস ব্র্যান অয়েল এক্সপোর্ট করছি। এই অয়েল শতভাগ আমাদের দেশে তৈরি। ওভারঅল আল্লাহর রহমতে আমাদের ব্যবসা ভালো যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক অর্থনীতি: বৈশ্বিক মহামারীতে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করতে হলে বলা যায়, ইউরোপ, আমেরিকা স্ট্রাগল করছে। ইন্ডিয়ার অবস্থা আপনারা জানেন। আমি মনে করি, বাংলাদেশ ভালো আছে। যেকোনো কারণেই হোক আমি সব সময় বলি, আমরা ভালো আছি। ব্যবসা কিন্তু বৈশ্বিক বিষয়। আন্তর্জাতিক বাজারে যদি গমের দাম বেড়ে যায়, আমাদের বাজারে বিস্কিটের দাম বেড়ে যাবে। ব্রাজিলে যদি সয়াবিন উৎপাদন কমে যায়, বাংলাদেশ সয়াবিন তেল কিনতে হবে বেশি দামে। তদুপরি আমাদের এখানে গার্মেন্টসে যতই পোশাক উৎপাদন করুক, ইউরোপে যদি কোভিড হয় আমাদের গার্মেন্টস কিন্তু ভালো রেটে বায়ার পাবে না। ইউরোপের নাগরিক যিনি পোশাক ক্রয় করবেন, তার যদি চাকুরী না থাকে, তাহলে তার ক্রয় করার ক্ষমতা থাকবে না।বাংলাদেশের মানুষ ভয়াবহভাবেকোভিডে আক্রান্ত না হলেও ইকোনোমি কিন্তু এফেক্টেড হচ্ছে।

অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি: এখন আপনারা যে আমাদের বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ দেখছেন, তার বেশিরভাগ অবদান আমাদের শ্রমিকদের। এই ক্ষেত্রে আমি এক্সপোর্ট করি বলে আমি আমার ক্রেডিট নেব না। আমি ক্রেডিটটা দিব আমাদের শ্রমিকদের। যারা বিদেশে গিয়ে কঠোর পরিশ্রম করছে। আমাদের এই শ্রমিকদের জন্যই আমাদের ইকোনোমি ভালো অবস্থানে আছে। তা না হলে আমরাও বিপদে পড়তাম। আজকে আমি যে, বিস্কিট, কেক, ক্যান্ডি তৈরি করছি, কারা এগুলো খাচ্ছে? আমাদের ৬০-৭০ লক্ষ প্রবাসী শ্রমিক আছেন। তাদের পরিবার কিন্তু এখানে আছে। যদি একেকটা ফ্যামিলিতে চারজন ধরেন, তিন থেকে সাড়ে তিন কোটি লোক বিদেশি টাকার উপরে নির্ভরশীল। এই শ্রমিকরা যদি বিদেশে চাকরি না করে, তাহলে আমরাও ঠিকমতো ব্যবসা করতে পারব না। এটা হচ্ছে একটা চেইন এফেক্ট।

এখন বিদেশে যদি কোভিড এফেক্ট করে, প্রবাসী শ্রমিকরাও এফেক্টেড হবে। আল্লাহর অশেষ রহমতে এশিয়ার শ্রমিক মিডলইস্টে বেশি। ইউরোপে শ্রমিক বেশি যায় না, বেশি যায় পেশাজীবী। পেশাজীবীরা টাকা বেশি পাঠায় না। শিক্ষিত পেশাজীবীরা কানাডা, ইউরোপ, আমেরিকা গিয়ে সেটেল হয়ে যায়। আমাদের বেশিরভাগ রেমিটেন্স আসছে মিডলইস্ট, মালয়েশিয়া এসব দেশ থেকে। ইনশাল্লাহ এশিয়াতে যেহেতু বৈশ্বিক মহামারী বেশি এফেক্টেড হচ্ছে না, এজন্য আমাদের ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ ভালো আছে। ইউরোপ যদি বড় ধরনের বৈশ্বিক মহামারীর আক্রান্ত না হয়, তাহলে আমাদের গার্মেন্টস সেক্টর ঠিক থাকবে ইনশাল্লাহ।

আমাদের শেয়ারবাজার: আমাদের শেয়ারবাজার ভালো আছে। প্রাইস বাড়ছে, ইন্ডেক্স বাড়ছে। আসলে বাস্তবতাটা বোঝা উচিৎ। আমি মনে করি(এটা আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ, শেয়ারের দাম বাঁড়া নিয়ে খুশি হওয়া ঠিক না। শেয়ারের দাম টিকে থাকবে কিনা, এটার দিকে নজর দেয়া জরুরী। কারণ আমরা দুবার ধাক্কা খেয়েছি। তৃতীয়বারে ধাক্কা আমরা কিন্তু সহ্য করতে পারবো না। আমরা অনেক সময় বলি সূচক বেড়ে যাচ্ছে। আসলে তার চেয়ে বড় কথা হল মার্কেট শক্তিশালী কিনা।মার্কেটের মৌলভিত্তিক শেয়ারের দাম ঠিক আছে কিনা। গ্যামব্লিং মার্কেট হতে পারবে না। মুখের কথায় শেয়ারের দাম বাড়া উচিৎ না। বর্তমান নিয়ন্ত্রক সংস্থা ভালো কাজ করছেন। আমাদের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটা প্রবণতা কাজ করে। আমরা লংটাইম বিনিয়োগ করতে চাই না। আমরা যদি মৌলভিত্তিক শেয়ার কিনে ডিভিডেন্ডের উপর নির্ভরশীল থাকতে পারি, তাহলে মৌলভিত্তিক শেয়ার একসময় ভালো রিটার্ন দেবে। আপনি যদি আজ গ্যামব্লিং শেয়ার কিনেন, তা এক সাপ্তাহে ডাবল রিটার্ন নাও দিতে পারে।আর যদি মৌলভিত্তিক শেয়ার কিনেন, সেটা এক সপ্তাহে ডাবল না দিলেও পাঁচ বছরে ডাবল দিবে। মৌলভিত্তিক শেয়ার সবসময় নিরাপদ। আপনার লস হবে না। কোনভাবেই রিউমারের উপরে বিশ্বাস করে শেয়ার কেনা উচিৎ না।

শেয়ার মার্কেট পুরোটাই একটি ফাইনান্সিয়াল মার্কেট। আপনি যদি কোম্পানির ব্যালেন্স শীট স্টাডি করতে না পারেন, তাহলে আপনাকে শেয়ার মার্কেটে না আসার অনুরোধ করছি। আপনি যে কোম্পানির শেয়ার কিনবেন, ওই কোম্পানির ব্যালেন্স শীট আপনাকে জানতে হবে। আমরা অনেকে শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করি, কিন্তু ব্যালেন্স শীট কি সেটা বুঝি না।

আমার কোম্পানি শেয়ার মার্কেটে লিস্টেড। তার ইপিএস, প্রোফাইল স্টাডি করবেন। কোম্পানির পরিচালকদের সম্পর্কে জানবেন । তারপর আপনি জাজমেন্টকরে শেয়ার কিনবেন। আমি সবাইকে অনুরোধ করব, আপনারা ব্যালেন্স শিট স্টাডি করে, মৌলভিত্তিক শেয়ারে বিনিয়োগ করুন।

লেখকঃ ভাইস চেয়ারম্যান, ভাইয়া গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে