এম. নজরুল ইসলাম: দেশেই শুধু নয়, প্রবাসেও ইতিহাস সৃষ্টি করেছে বাঙালী। নেতৃত্বের অগ্রসারিতে আজ বাঙালীর নাম সমুজ্জ্বল। ব্রিটিশ রাজনীতিতে বাঙালী মেয়েদের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে। এই তালিকায় যিনি নিজের যোগ্যতায় স্থান করে নিয়েছেন তিনি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক। তাঁর মা শেখ রেহানাকে নিশ্চয়ই সবার কাছে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে না। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট মেয়ে তিনি, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন। দীর্ঘদিন বসবাস করেছেন লন্ডনে। তাঁরই জ্যেষ্ঠ কন্যা টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক। এতদিন হয়ত এ পরিচয়েই সীমাবদ্ধ রাখা যেত তাঁকে। কিন্তু টিউলিপ বর্তমানে অন্য এক পরিচয়ে নিজেকে তুলে ধরেছেন। বিলেতে বাঙালীর গর্ব তিনি। সেখানে তিনি বাঙালীর প্রতিনিধি। লন্ডনের ক্যামডেন কাউন্সিলে নির্বাচিত প্রথম বাঙালী নারী কেবিনেট মেম্বার ফর কমিউনিটিজ এ্যান্ড কালচার টিউলিপ সিদ্দিক এখন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য। হ্যামস্টেড কিলবার্ন নির্বাচন কেন্দ্র থেকে লেবার পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে ২০১৫, ২০১৭ সালের পর ২০১৯ সালে তৃতীয়বারের মতো জয়ী হয়ে নতুন ইতিহাস রচনা করেছেন তিনি। সম্প্রতি ব্রিটেনের ছায়া শিশুবিষয়কমন্ত্রী পদে পদোন্নতি পেয়েছেন টিউলিপ সিদ্দিক। গত ১০ এপ্রিল, শুক্রবার বাংলাদেশ সময় ভোরে ব্রিটেনের বিরোধী দল লেবার পার্টির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতদিন তিনি শ্যাডো আর্লি ইয়ারস মিনিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। বাঙালী ও বাংলাদেশের জন্য এ এক অনন্য অর্জন। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, আজকের ক্যারিয়ার পলিটিশিয়ান টিউলিপ সিদ্দিক মাত্র ১৬ বছর বয়সে লেবার পার্টির সদস্য হয়ে যুক্ত হন ব্রিটিশ রাজনীতিতে।

গ্লোবাল ভিলেজ মতবাদের পক্ষে যাঁদের অবস্থান তাঁরা নিজেদের বিশ্ব নাগরিক হিসেবেই ভাবতে ভালবাসেন। বিশ্ব নাগরিকত্বের পথে নিজেকে একধাপ এগিয়ে রেখেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য এখন বিলেতের রাজনীতিতেও রীতিমতো প্রভাব বিস্তার করেছেন, এমপি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। লন্ডনের বাঙালী কমিউনিটিও টিউলিপের এই বিজয়ে বাঙালী হিসেবে গর্ব অনুভব করে।

সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তাঁর এক নিবন্ধে টিউলিপ সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সন্দেহ নেই, বঙ্গবন্ধুও চাইতেন, বাঙালী তার জাতীয় স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা নিয়ে জেগে উঠুক এবং বিশ্ব জাতীয়তার মোহনায় আপন বৈশিষ্ট্য নিয়ে মিলিত হোক। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার ছেলেমেয়েরা তাঁর সেই সাধই পূর্ণ করেছে বলে মনে হয়। যদি তা না হতো তাহলে বিলাতে বাস করে, উচ্চশিক্ষা লাভ করে, চারদিকে এত অর্থবিত্তের পেশা থাকতে টিউলিপ রাজনীতিকে তার পেশা হিসেবে গ্রহণ করত না।’

বঙ্গবন্ধুর জীবন এবং আদর্শই যে তাঁর চরিত্র গঠন করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান যাঁরা তাঁরা পূর্বসূরিদের অনুসারী হবেন, এটা স্বতঃসিদ্ধ। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে, গত বছরের কোন এক সময় টিউলিপ লন্ডনের সান্ধ্য দৈনিক ইভনিং স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, ‘গ্র্যান্ডফাদারের আদর্শই আমার চরিত্র গঠন করেছে। পারিবারিক ঐতিহ্যই আমাকে একজন স্ট্রং সোস্যালিস্টে পরিণত করেছে।’

১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পরিবারের সব সদস্যকে হারিয়েও ধৈর্য হারাননি। প্রবাসে কষ্টের জীবন বেছে নিতে বাধ্য হলেও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি কোনদিন। বাংলাদেশের আরেক প্রভাবশালী ‘সামরিক-রাজনৈতিক’ পরিবারের সঙ্গে এই পরিবারটির একটি আদর্শগত পার্থক্য আছে। যেখানে ঐ পরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম বিদ্যাচর্চাকে দূরে সরিয়ে রেখেছে, সেখানে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা তাঁদের সন্তানদের যথার্থ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছেন দুই বোনের সন্তানরা।

২০১০ সালে টিউলিপ প্রথম কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ব্রিটিশ রাজনীতিতেও বাঙালীর উপস্থিতি এবং প্রভাব বাড়ছে যাদের কারণে তিনি তাঁদেরই একজন। রাজনীতি ও সমাজকর্মে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন নানামুখী কাজের ভেতর দিয়ে। এ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ফিলিপ গ্লাউড এ্যাসোসিয়েটস, সেভ দ্য চিলড্রেন, বেথনাল গ্রিন এ্যান্ড বো আসনের সাবেক লেবার এমপি ওনা কিং, টুটিং এলাকার লেবার এমপি ও সাবেক মন্ত্রী সাদেক খান, লেইটন ওয়ানস্টেড এলাকার সাবেক লেবার এমপি হ্যারি কোহেনের সঙ্গে কাজ করেছেন। ক্যামডেন ও ইজলিংটন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের গবর্নর, কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এ্যাসোসিয়েশন ইউকের সদস্য ও এমপি টিসা জোয়েলের পলিসি এ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। লেবার পার্টির ইয়ং লেবার অফিসার হিসেবে কাজ করেছেন টিউলিপ সিদ্দিক। লেবার নেতা এ্যাড মিলিব্যান্ডের লিডারশিপ ক্যাম্পেইনের ফিল্ড ডেপুটি ডিরেক্টর ছাড়াও লন্ডন লেবার পার্টির প্রেস অফিসার, গ্রেটার লন্ডন অথরিটির রিসার্চার হিসেবে কাজ করার ব্যাপক অভিজ্ঞতায় নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। ব্রিটিশ রাজনীতির উপযুক্ত করে গড়ে তুলেছেন নিজেকে।

প্রবাসে থেকেও যে জনকল্যাণে কাজ করা যায়, যুক্ত হওয়া যায় রাজনীতিতে তা প্রমাণ করেছেন টিউলিপ। বলেছেন, মানুষের সেবা করা যায় যে কোন স্থানে থেকেই। অনেকে মনে করেন বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরি হিসেবে বাংলাদেশে এসেও তো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হতে পারতেন টিউলিপ। ভূমিকা রাখতে পারতেন দেশের উন্নয়নে। যেমনটি রাখছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। টিউলিপ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যোগ দিলে হয়ত অনেকেই খুশি হতেন। কারণ, বাংলাদেশের রাজনীতির সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর মতো উচ্চশিক্ষিত, আর্টিকুলেট, সমাজতন্ত্র ও সেকুলারিজমে বিশ্বাসী নেতাকর্মীর বিশেষ প্রয়োজন। তাঁকে এমন প্রশ্নের মুখোমুখিও হতে হয়েছে। যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে লন্ডনের হ্যামস্টেড এ্যান্ড কিলবার্ন আসনে লেবার পার্টির মনোনয়ন নিশ্চিত করার পর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে এর জবাবও দেন তিনি। টিউলিপ বলেন, ‘আমি যদি বাংলাদেশে গিয়ে দাঁড়াতাম আপনারাই কিন্তু বলতেন, ডায়নেস্টি পলিটিকস। নিজে পেরেছ করতে, নাকি তোমার ফ্যামিলির সাহায্য নিয়ে করেছ।’ বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক নিষ্ঠার পরিচয় এই বয়সে টিউলিপ সিদ্দিকের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। সমাজতন্ত্র ও বাম চিন্তা-চেতনার স্পষ্ট বিকাশ তাঁর মধ্যে দেখা যাচ্ছে।

১৬ সেপ্টেম্বর টিউলিপ সিদ্দিকের জন্মদিন। দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের মেরটন কাউন্সিলের মিটচাম এলাকায় ১৯৮২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর তাঁর জন্ম। বিলেতে বাঙালীর প্রতিনিধি হিসেবে এই সংগ্রামী জাতির মুখ আরও উজ্জ্বল করুন তিনি। বিশ্বের দরবারে বাঙালীকে পৌঁছে দিন বিশ্ব নাগরিকের সম্মানজনক অবস্থানে- জন্মদিনে এটাই আমাদের একমাত্র চাওয়া। শুভ জন্মদিন টিউলিপ।

লেখক: সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং অস্ট্রিয়া প্রবাসী লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিক

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে