মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রিন্স: করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে সমগ্র পৃথিবী এখন যেন স্থির হয়ে আছে, পুরো বিশ্বই এক মৃত্যুপুরী। থমকে গেছে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বন্ধ হয়ে গেছে স্কুল, কলেজ ও সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ইউনেস্কো এর সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী বিশ্বের ১৩০টি দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে সরকার সবার আগে যে পদক্ষেপটি নিয়েছে তা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা। তখন থেকেই অদ্যবদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এরই মধ্যে বলেছেন করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে প্রয়োজনে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হবে। দীর্ঘ সময় এ অপ্রত্যাশিত শিক্ষা বিরতিতে শিক্ষার্থীদের পঠন-পাঠন যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি মানসিকভাবেও তারা ভালো নেই। সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রাথমিক স্তরের ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের উপর। শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার পাশাপাশি সামাজিকতা, খেলাধূলা ও সাংস্কৃতিক চর্চা বিদ্যালয়েই পেয়ে থাকে।

বিদ্যালয় হলো শিক্ষার্থীদের আনন্দের ভুবন। বিদ্যালয়ে আসা যাওয়া, বাসায় বাড়ির কাজ তৈরি ছিল শিক্ষার্থীদের একটি রুটিন ওয়ার্ক। দীর্ঘ সময় বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় অভিভাবকগণ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ধরে রাখতে শত চেষ্টা চালালেও তারা এখন সে রুটিন ওয়ার্কে বিশ্বাসী নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পুঁথিগত বিদ্যার বাহিরে শিক্ষার্থীদের বড় প্রত্যাশার জায়গাটি হলো খেলাধুলা ও বন্ধু মহল। এমন পরিস্থিতিতে তারা সেসব মিস করছে বড় বেশি।

পয়লা এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা এ মহামারিতে অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত রয়েছে। এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষার ফলাফল বিলম্ব করে প্রকাশিত হলেও কলেজে ভর্তি অনিশ্চয়তায় তারা রয়েছে। এ পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা গভীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করছে। অনার্স /মাস্টার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা সেসন জটের চরম শঙ্কায় রয়েছে। সামগ্রিক বিবেচনায় বিপর্যস্ত পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা। উত্তরণে করণীয় এখনই সংশ্লিষ্ট কর্তপক্ষের ভাবা উচিত।

যেহেতু সবাই বাড়িতে থাকতে বাধ্য হচ্ছে, সেক্ষেত্রে উদ্ভত পরিস্থিতিতে বাড়িতে বসেও শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে আমার কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরছি-

০১. ই-লার্নিং শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে চালু করা যেতে পারে।

০২. শিক্ষার্থীদের পঠন – পাঠনে মনোযোগ আকৃষ্ট করতে খেলাধূলা ও বিনোদন বিষয়ক কার্যক্রম ই-লার্নিং পাঠের সাথে সংযুক্ত করা যেতে পারে।

০৩. শিক্ষার্থীদের পাঠে স্থবিরতা দূরীকরণে শিক্ষক ও গাইড বই নির্ভরশীলতা কমাতে প্রদত্ত পাঠ্যসূচী সংক্ষিপ্ত করতে হবে এবং পাঠদানে ই-লার্নিং এ সহজ উপস্থাপন কৌশল সংযোজন করতে হবে।

০৪. সংসদ টেলিভিশনের পাশাপাশি বিটিভি সহ জনপ্রিয় আরও কয়েকটি টিভি চ্যানেলে একটি নির্ধারিত সময়ের জন্য ই-লার্নিং শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রচারের কার্যকর ব্যবস্থা সরকারকে তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নিতে হবে।

০৫. শিক্ষকের শিক্ষকতা পেশা শুধু চাকরি নয় বরং শিক্ষক হলো আলোকিত সমাজ ও জাতি বিনির্মানের পুরোধা, তাই শিক্ষকদের এ বিষয়ে যথেষ্ট যত্নশীল হতে হবে।

০৬. সকল স্তরের শিক্ষার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে লেখা-পড়া চালিয়ে যেতে পারে, সে জন্য সরকার শিক্ষার্থীদেরকে টিভি, রেডিও,মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ফ্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করবে।

০৭. উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষা খাতের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে ছুটি সংকোচন সহ যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সপ্তাহে দু’দিন ছুটি তা একদিন করতে হবে।

০৮. করোনা উত্তর নিরাপদ স্কুল পরিচালনার পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, হাইজিন উপকরণ ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা, রোগ প্রতিরোধ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রচার, শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্বিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য শিক্ষক ও সেবাদানকারীদের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি বিষয়ে সরকারকে এখনই উদ্যেগ নিতে হবে।

০৯. শিক্ষার্থীদের শিখন শেখানো কার্যক্রম চলমান রাখা এবং অনলাইন, রেডিও ও টেলিভিশন ভিত্তিক বিকল্প হরেকরকম শিক্ষা প্রোগ্রাম এর ডিজাইন ও সেগুলো তৈরি করা সহ দূরবর্তী শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

১০.শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক মহামারীর বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবেলায় জ্ঞান বিনিময় ও সক্ষমতা তৈরি এবং ভবিষ্যতে অনুরূপ কোন মহামারী উত্তরণে করণীয় সম্পর্কে ধারণা প্রদান করার উদ্যেগ এখনই নেয়া প্রয়োজন।

পরিশেষে বলতে চাই, শিক্ষা মন্ত্রণালয় হলো শিক্ষার জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দপ্তর। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক হলো শিক্ষার সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মূল চাবিকাঠি। আমাদের দেশের শিক্ষার ৯৭ ভাগ বেসরকারী খাতে। নানা দুঃখ – বেদনা ও বৈষম্যের মধ্য দিয়ে চলছে বেসরকারি শিক্ষা খাত। এমপিও,নন এমপিও,কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসা ও অনার্স /মাস্টার্স পর্যায়ে নন এমপিও শিক্ষক – কর্মচারীবৃন্দ বৈশ্বিক এ করোনা মহামারীতে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ দুর্যোগ কালীন সময়ে অভিভাবকগণ শিক্ষার্থীদের মাসিক টিউশন ফি নিয়মিত পরিশোধ না করায় ৯৯ ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক/কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠান অংশের বেতন বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম বা কোন কোন প্রতিষ্ঠানে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে শিক্ষকরা মহান পেশায় নিজেদের জড়ানোর বিবেচনায় আত্মসম্মানবোধ থেকে কারও কাছে সাহায্যের হাতও বাড়াতে পারছেনা।

শিক্ষকদের বঞ্চিত রেখে শিক্ষার কাংখিত লক্ষ্য অর্জন সুদূর পরাহত। তাই শিক্ষার সামগ্রিক বিবেচনায় বাংলাদেশ শিক্ষক ইউনিয়ন – বাশিইউ সহ সকল শিক্ষক সংগঠন শিক্ষা সরকারীকরণের দাবি জানিয়ে আসছে।

সরকারীকরণ কিংবা জাতীয়করণ যেহেতু সময় সাপেক্ষ বিষয় তাই করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় শিক্ষকদের আসন্ন ঈদ-উল-আযহা থেকে ২৫% এর স্থলে পূর্নাঙ্গ ঈদ বোনাস প্রদান,বাড়ি ভাড়া জুলাই-২০২০ হতে ১০০০ টাকার স্থলে মূল স্কেলের ৫০% এবং চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকার স্থলে মূল স্কেলের ২৫% প্রদানের দাবি জানাই। এছাড়া নন এমপিও শিক্ষক/কর্মচারীদের বিশেষ প্রণোদনা অব্যাহত রাখার সুপারিশ করছি।

মুজিব বর্ষ উপলক্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি ঘোষণাই শিক্ষা খাতের পুরো চিত্র পাল্টে দিতে পারে তা হলো শিক্ষা সরকারীকরণ বা জাতীয়করণ।কারণ স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি পূর্বক পুরো প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করে গেছেন। তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পুরো শিক্ষক সমাজ এ সময়ে এমনটাই প্রত্যাশা করেন।

লেখক: অতিরিক্ত মহাসচিব, বাংলাদেশ শিক্ষক ইউনিয়ন – বাশিইউ এবং শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে