ইকবাল আহমেদ লিটন: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চিরন্তন উক্তি দিয়ে আজকের লেখাটি শুরু করছি:

আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি চাই। তিনি বলেছিলেন, কিছু কিছু লোক যখন মধু-মক্ষিকার গন্ধ পায় তখন তারা এসে আওয়ামী লীগে ভিড় জমায়। আওয়ামী লীগের নামে লুটতরাজ করে। পারমিট নিয়ে ব্যবসা করার চেষ্টা করে। আওয়ামী লীগ কর্মীরা, আওয়ামী লীগ থেকে তাদের উৎখাত করে দিতে হবে, আওয়ামী লীগে থাকার তাদের অধিকার নাই। যাইহোক, কিছুদিন ধরে বারবার একটা কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এবার সূদুর আয়ারল্যান্ড থেকে ঢাকায় এসে আমার দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আচরন ও চরিত্র খেয়াল করলাম। এ যেন সরকারী মাল দরিয়ামে ঢাল। আমার দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘নীতিহীনরা রাজনীতি করে, নীতিবানেরা নিশ্চুপ। সুশীল যারা তর্ক করে আমজনতাই বেকুব!’ উক্তিটি যদিও একান্তই আমার মনে উদিত হওয়া কয়েকটা লাইনমাত্র, তথাপি কখনো কখনো বাস্তবতার আলোকে এটাকেই যথার্থ বলে থাকি আমি। আমাদের দেশের স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পরে শুদ্ধ রাজনীতির বিকাশ হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। ইতিহাস পর্যালোচনা করে বা স্টাডি করে যা দেখেছি তা কেবল আতঙ্কিতই করে আমাদের।

লুটেরাদের লুটপাট ও হিংসাত্মক রাজনীতি আমাদের পুরো জাতিকে কলুষিত করেছে বারবার। বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে যখন বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল তখন সমগ্র বিশ্ব অবাক হয়েছিল বাঙালিদের একতা দেখে, সাহস ও সততা দেখে। কিন্তু আজ আমাদের রাজনৈতিক আচরণ আমজনতার মনে প্রশ্নবিদ্ধ। লুটপাটের রাজনীতিতে বার বার পুড়ে ছারখার হচ্ছে বঙ্গবন্ধু কন্যার সব উন্নয়ন, সব সম্মান। সামাজিক, অর্থনৈতিক সব উন্নয়নকে কোনো’না কোনোভাবে প্রভাবিত করছে আমাদের রাজনৈতিক অস্থিরতা। এদেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সবাই মুখে উন্নয়নের মন্ত্র আওড়ালেও, মূলত উন্নয়ন ধ্বংস করার সব উপকরণ আমাদের রাজনীতিতে বিদ্যমান। আর সাধারণ জনগণকে বরাবরই রাজনীতির বলির পাঁঠা হতে হয়।

আমাদের দেশের সরল মানুষগুলো রাজনৈতিক নেতাদের সামনে রেখে স্লোগান দিয়ে মিছিল করে, তাদের ভোট ব্যালটে পার করে দিয়ে থাকে নির্বাচনী পুলসিরাত, জয়লাভের পর এসব সাধারণ মানুষগুলোই রাজনীতিবিদদের হিংস্রতার শিকার হয়। ‘দমন করো, গ্রাস করো’ এমন নীতি এখন রাজনৈতিক নেতাদের আচরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইন, নিয়ম কিংবা নীতির তোয়াক্কা করছে না এদের কেউই। বঙ্গবন্ধু পরবর্তী সব রাজনৈতিক নেতাগুলোই এমন নীতিতে বলিয়ান হয়েছে। যার ফলে দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের খেতাবটিও এক সময় আমাদের দখলে চলে আসে। আমাদের প্রতিটা রাজনৈতিক দলই দুর্নীতির আর নিপীড়নের খেলায় অভ্যস্ত। কেউ কম কেউ বেশি। কেউ প্রতিপক্ষ’কে কিভাবে নির্মমভাবে ঘায়েল করা যায়, কত নির্দয়ভাবে উৎখাত করা যায় রাজনীতির মাঠ থেকে। আবার কেউবা জনগনের উপর চালায় স্ট্রিম রোলার। প্রতিটা রাজনৈতিক দলের মাঝেই এ ধরনের প্রবণতা দেখে অভ্যস্ত আমরা। কিন্তু কষ্ট ও দুঃখ হয় যখন দেখি বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গবন্ধু কন্যার আওয়ামী লীগে এমন চাটুকার আর বদমাশ স্বভাবের নেতা নির্বাচিত হয়ে নিরবে দেশকে ধ্বংসের কাজে লিপ্ত। মাঝে মাঝে মনে হয় সত্যিই কি আমরা স্বাধীন? সগৌরবে উড়তে থাকা ওই পতাকার দিকে তাকিয়ে প্রায়শই বিস্মিত হই আমরা, এই কি তবে রক্তে কেনা ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল?

দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গন। রাজনীতিবিদদের ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠছে হাজারো দুর্নীতিগ্রস্ত লোক। দেশের প্রতিটা অর্থনৈতিক সেক্টর এসব দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদদের দখলে। প্রতিটা সরকারের সময় একই চিত্র দেখি আমরা। সম্প্রতিও আঁতকে উঠার মতো কিছু দুর্নীতির চিত্র দেখতে পাই আমরা, এর পূর্বেও দেখেছি। লুটতরাজ, খুন, মাদক ব্যবসায়, অর্থপ্রাচার, সম্পদ আত্মসাৎ এ ধরনের ঘটনাগুলো রাজনৈতিক ছত্রছায়াতেই ঘটে থাকে, কোথাও কোনোটার সঠিক ব্যাখ্যা পাই না আমরা জনসাধারণ। আমাদের দেশটাতে প্রকৃত স্বাধীনতা ভোগ করে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সোনার বাংলা গড়ার সব উপকরণ বিদ্যমান। তার জন্য প্রয়োজন সৎ ও মানবিক মনমানসিকতা। প্রতিটা রাজনৈতিক দলেরই উচিত স্বার্থের জন্য, নিজে বাঁচো নীতিতে যারা বিশ্বাসী এসব রাজনৈতিক নেতাদের চিহ্নিত করে দল থেকে বহিষ্কার করা। রাজনীতির এ ধরনের আচরণের কারণে সাধারণ মানুষের কাছে গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটাই উল্টে যেতে বসেছে। মাঝে মাঝে মনে হয়- ‘নীতিহীন রাজনীতি, অদ্ভুত এক তন্ত্র আমাদের রাজনীতি তারেই বলে গণতন্ত্র!’ দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত কোনো ব্যক্তিকে কোনো মতেই রাজনীতি করার অধিকার দেয়া যেতে পারে না। কথায় কথায় বলতে হয়, হেনরি কিসিঞ্জার যখন বলেছিলেন- ‘বাংলাদেশ তলা ছাড়া ঝুঁড়ি’। বঙ্গবন্ধুর বিচক্ষণতায়, বলিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্বে মাত্র দুই বছরে প্রমাণ করতে পেরেছিলেন বাংলাদেশ তলা ছাড়া ঝুঁড়ি নয়। আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যেও যদি জনগণের কল্যাণের উদ্দেশ্য থাকে, যদি সততা ও নীতি থাকে তাহলে শান্তিময়, সুশৃঙ্খল জাতি গড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। আমাদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বহু স্বর্ণ সন্তানের হাত ধরে এগিয়েছে। তিতুমীর, মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরোওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এরকম বহু সূর্য সন্তান বাংলাদেশে শুদ্ধ রাজনীতির দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। বর্তমান রাজনৈতিক নেতারা ভুলে গেছেন তাদের সেই আদর্শ, যার ফলে এদেশের রাজনীতি পরিণত হচ্ছে পঁচা বাসি ডাস্টবিনে। আমাদের দেশে শৃঙ্খলা ফেরাতে শুদ্ধ রাজনৈতিক চর্চার বিকল্প নেই। উন্নয়নের প্রতি নামমাত্র শ্রদ্ধাবোধ থেকে উঠে এসে সঠিক উন্নয়নের ধারক ও বাহক হয়ে কাজ করা উচিত সবাইকে।

লেখকঃ- সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, সদস্য সচিব আয়ারল্যান্ড আওয়ামী লীগ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে