মোহাম্মদ বেলাল হোসেন চৌধুরী:

১. গ্রামে থেকে ১৯৮০ সালে ঢাকায় আসি। তাল-বেতাল, লাল-নীল বাতির শহর। যেন উপেক্ষিত বেমানান এক কিশোর। শীত-বসন্ত, শরৎ-হেমন্ত কেটেছে হীনমন্য, বিষণ্ণ উৎকন্ঠায়। গন্তব্যহীন, লক্ষ্যহীন অনিশ্চয়তায়।

২. ‘মানুষ হবেনা’ বলেও অনেক নিকটজন ভবিষ্যদ্বাণী করলেন। ‘তুমি পারবে’ কেবল মা বললেন! সেই যে নামিয়ে দিলেন! চাকরির ছাব্বিশ বছর পেরুলাম। গত বছর মা’ও স্মৃতি হয়ে গেলেন। আমি নেমেই রইলাম…..

৩. মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে চাকরিতে কাস্টমসে। আগে কোথাও একদিনও চাকরি করিনি। দিনলিপি শুরু নবীণ কর্মীর। দুরুদুরু মনে আশা-নিরাশার দোলাচলে। ছাব্বিশ বছর কেটে গেছে এখানে ওখানে। সময় বাহন হয়ে টেনে নেয়।

৪. অন্যের টাকা সরকারের জন্য আনার আমলা! কঠিন কাজ বটে। আমলাতান্ত্রিকতার সসীমতায় দুর্লংঘ্য ‘নিরাসক্ত’ লক্ষ্য অর্জনও। সামর্থ্যের যতোদূর পেরেছি দাঁড়িয়েছি, দেশ, দেশের মানুষ, বিভাগের সেবাদানে…..

৫. পরিশ্রম সবসময় সৌভাগ্যের প্রসূতি–এর ব্যতিক্রমও হয়। বুদ্ধি বিবেচনা বিশ্লেষণের পরিশ্রমই বেশী কাজে দেয়। রাতদিন পড়েও খুব কাছের ক’জন চাকরি পাননি। ভাগ্যবানের দ্বৈবচয়নও সহায়ক। পথপ্রদর্শকরা যেভাবে পাথেয় হন।

৬. আব্রাহাম লিংকন বলেছেন, Be sure you put your feet in the right place, then stand firm. এ সঠিক জায়গাটা পাওয়া আসলেই মুশকিল। আইন পড়ে বিচারক হবার স্বপ্নভঙ্গের তাড়নায় মনে হয় আরো জটিল। নিজের অবস্থানে মানুষ সুখী নয়।

৭. মেধাক্রমে নম্বর তিন দেখে একজন বললো, রেজাল্ট মনে হয় ভুল। আমিতো এতো ভালো করার মতো না। নিজের মনও সায় দিল। চাওয়ার আগে পাওয়া হলে যা হয়! নিজেরে চিনতেই ভুল যতো আমাদের।

৮. গিয়েছিলাম বিসিএস কেমন একটু দেখতে। পরেরবার চাকরির জন্য দেব ভেবে। সরকার বাহাদুর চাকরিটা দিয়ে দিলেন। ছাত্রত্ব কাটেনি। প্রস্তুতি নেই। বড় ভাইকে বিয়ে করাতে গিয়ে নিজের বিয়ের মতো।

৯. মা’র দেয়া সরল আত্মবিশ্বাসটুকু সম্বল! প্রয়োজতত্বের বুদ্ধি, সাধনা, পরিশ্রমের সম্মিলনে চাকরি পেয়েও যতো তালগোল! এয়ারপোর্টে মুরগি মিলন, মুনির, টোকাই সাগরের সাথে বাধে গন্ডগোল।

১০. মাঝে কয়েকবার চাকরিটা ছাড়তে চেয়েছি। নানানাত্রিক কারণে! পরিবার, নিকটজনের চাপে হয়নি! রুহুল আমিন ভাই শুনে খুব ক্ষেপে গেলেন। ধরা সহজ হলেও ছাড়া কঠিন।

১১. যুক্তরাষ্ট্রে ২০০০ সালে পুত্র হাসিবের জন্ম। সপরিবারেও থাকিনি। ল’ফার্মে ভালো চাকরির প্রস্তাবও ছিল। মা দাদী দুজনেরই কড়া মানা। আমারও মন টেকে না। জটিল-কঠিন আমলাতন্ত্র ভালোবেসে পড়ে রইলাম।

১২. নীরবেই যাচ্ছিল ১৫ নভেম্বর। অনলাইন রিটার্ন জমার শেষ দিন! কাজের ব্যঘাত হবে। দিনটি চলেও গেছে সেভাবে। অফিসে ঘরে বাইরে অগোচরে। সন্ধ্যায় হলো বিপত্তি। সাতষট্টিতম জুম রাজস্ব সভায়। কথায় ‘ছাব্বিশ’ বছর চাকরির প্রসঙ্গ এসে যায় । এডিসি ডিসিকে পাঠালেন, কালকে আয়োজনে আমাকে থাকতে। নিকটজনের কাছে ভাব লুকানো যায় না।

১৩. অনুপ্রেরণা সংক্রামক! পুরনো কথা। আজ আমি নিবিড় সংক্রমিত! অনেক দিন পর মনে পড়ল ‘ঐশ্বর্যবান’! বেনাপোলে এক প্রিয় কর্মকর্তার পছন্দের শব্দ! সেই বেনাপোলীয় অনুভবে। তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারই দান. . .

১৪. লিখবনা ভেবেছি। ব্যাচমেট বন্ধুরা ফেসবুকে লিখছে। মনে পড়ল মাননীয় সচিব মুনিরুস সালেহীন স্যারের চাকরির ছাব্বিশ বছর পুর্তিতে ২০১৭সালে লেখা পোস্টটি। তথ্যসমৃদ্ধ লেখাটি ব্যতিক্রমী স্পন্দনের। সহকর্মীদের হৃদয়সিক্ত অভিব্যক্তি ত্বরান্বিত করে।

১৫. ‘মেঘনা’ সম্মেলন কক্ষ জনাকীর্ণ। ফুল, কেক, ব্যানার, ক্রেস্টের সমাহার। সবার সতর্ক ব্যস্ততায়ও চতুর্দিকে উৎসব বারতা। কুমিল্লায় ছোট উপলক্ষ্যগুলোও উৎসবমুখর পালিত হয়।

১৬. দু ঘন্টা কখন কেটে গেল। যেন ‘দশ মিনিট’। উপস্থিতি তন্ময় আবেশিত। আব্দুল হাকিমের অসাধারণ উপস্থাপনায় অভিনবত্ব, সহকর্মীদের উদ্বুদ্ধকরণ, প্রতিটি স্তরে নিপুনতা দারুণ মুগ্ধতা ছড়িয়ে।

১৭. আয়োজন ঘিরে ফখরুলের চিত্তচাঞ্চল্যও দারুণ উপভোগ্য। এ একটা অনুষ্ঠান কমিশনারের সম্পৃক্তি ছাড়া আয়োজন বলে হয়তো। সভায় অন্যদের বক্তব্যের সুক্ষদর্শন বিশ্লেষণও নতুন ব্যঞ্জনার ছিল।

১৮. স্বস্তির ছিল, কর্মকর্তারা প্রত্যেকে গত এক বছরে কুমিল্লায় নিজের পরিবর্তনগুলোকে ‘প্রাপ্তি’ দেখছেন। কথায় কিছু আনকোরা বিষয় উঠে এসেছে। আগে কখনো খেয়াল করিনি। ভালোর মধ্য অনেক ভালো অজ্ঞাতেও ঘটে।

১৯. যখন যা করেছি, হৃদয় দিয়ে করেছি। আজ মনে হলো, নিজের মনোভাব টীমকে অনেকটা বোঝাতে পেরেছি। সহকর্মীদের হৃদ্যতা, আয়োজন ও অভিধা যেন আমেরিকা থেকে ফেরারই সার্থকতা।

২০. মা’কে আজ খুব মনে পড়ছে। বখে যাওয়া প্রায় তাঁর সেই পুত্র মাথা নত করেনি। সত্য ন্যায় আইন প্রতিষ্ঠায় বিড়ম্বিত হলেও দমে যায়নি। শৈশবে বড় করা পরম আদরের দাদী। এমন করে আর কেউ কাঁদেনা। আব্বা এখনো কাছে না থাকা অক্ষম পুত্রের অপেক্ষায় থাকেন।

২১. শিক্ষকের অবদানেই মাত্র একুশ বছর বয়সে চাকরির আবেদন করা। সকল চির উন্নত শির শিক্ষাগুরুকে শ্রদ্ধা! তাঁরা নাহলেও আমরাও না।

২২. আমার কমিশনার সর্বজনাব শ্রদ্ধেয় মরহুম আজিজার রহমান, মরহুম ফখরুল আবেদীন, আলাউদ্দিন চৌধুরী, ফরিদ উদ্দিন, রেজাউল হাসান, নাসির উদ্দিন, শাহআলম খান। সবাই এখন অবসরে। প্রত্যেকেই অগুনিতক নি:শর্ত স্নেহ নির্ভরতা পেয়েছি। অযাচিত অধিকার খাটিয়েছি। শ্রদ্ধা সবার জন্য।

২৩. ছাব্বিশ মাত্র পার করেছি। আল্লাহ চাইলে আরো দশ বছর যেতে হবে। দায়িত্ব যেখানে যেটুকু সুন্দর, সম্মানের সাথে পালন করতে চাই। আল্লাহ বলেছেন, তোমার জন্য প্রথমের চেয়ে শেষ ভালো! না চাইতেই ক্ষুদ্র এ জীবনে অনেক পেয়েছি। কতটুকু দিতে পেরেছি জানিনা। কৃতজ্ঞতা মহান আল্লাহর। তিনি দৃশ্যত অপ্রাপ্তিগুলোও প্রাপ্তি করে দেন। সুযোগ, স্বীকৃতি, সম্মান, সমীহে বেশুমার প্রাপ্তি।

২৪. ওরা আমার চেয়ে ভালো করেছে। গুছানো মানসম্মত শৃংখলাবদ্ধ আয়োজন। আমাদের ছেলেরা শিখে গেছে। আরো ভালো পারবে। সাফল্য ধরে থাকা ও রাখার বিষয়।

২৫. এমন ঐশ্বর্যময় দিন সুখস্মৃতিতে স্মরণীয়। ধন্যবাদ এডিসি আব্দুল হাকিম, ডিসি ফখরুল আমিন চৌধুরী, সদর দপ্তর ও কুমিল্লা বিভাগের পরিশ্রমী আরও, এআরওদেরকে। ধন্যবাদ উদ্বুদ্ধ দেলোয়ার হোসেন মানিক, একেএম লুৎফর রহমান, পারভেজ আহমেদ ‘লিফটে ঢোকাতে না পারা’ ছাব্বিশ সিঁড়ির বিশাল কেক ও ফুলের জন্য।

২৬. আমার অভিজ্ঞতা শুনতে চেয়েছে ওরা। যোগদান থেকে আজকে পর্যন্ত মেনেছি। স্বত:সিদ্ধ বিষয়। আইন ও বিভাগের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে। ‘জাত’ ও ‘জুইত্’ আলাদা বিষয় হলেও সফল হতে হলে সমন্বয় করতে হয়। অবশ্যই ‘জাত’ ওপরে। পেশাগত জীবনে ভীতি, হুমকি, ধামকি, বিড়ম্বনা, বঞ্চনা এসেছে। দমিনি, দম ধরেই আছি!
সবার দোয়া চাই— আল্লাহ যেন সেবায় কবুল করেন, সম্মানে থাকার তাওফিক দেন।

লেখকঃ কাস্টমস কমিশনার, কাস্টমস এক্সাইজ এন্ড ভ্যাট কমিশনারেট, কুমিল্লা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে