ইকবাল আহমেদ লিটন: আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমার শ্রদ্ধা আর ভালবাসা অপরিসীম। ছোট বেলা থেকে মুক্তিযুদ্ধের কোন ইতিহাস বা গল্প পড়ে বহুবার আমি অশ্রসিক্ত হয়েছি। এখনো মুক্তিযুদ্ধের কোন বীরত্বগাঁথা আর বেদনাদায়ক ঘটনা শুনলে আমি আবেগ আপলুত হয়। আমি আজ ও শিহরিত হই সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের অপরিমেয় কষ্টের সেই দিন গুলোর কথা শুনলে। আমি প্রথমে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি বাংলাদেশের মহান স্থপতি স্বাধীনতার মহানায়ক হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির -জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি ও প্রতিটি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি রইলো আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালবাসা!

বাঙালী জাতির জীবনে মুক্তিযুদ্ধ একটি উজ্জ্বল ইতিহাস। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা বিশ্বের ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনকারী অধ্যায়। পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য কত কঠিন সংগ্রাম আর আত্মদান করতে হয়েছে, জানে তা বাঙালী। কিন্তু এই অবদানচিত্র ক্রমশ ধূসর হয়ে আসছে। ‘বাঙালীর ইতিহাস নাই’ বলে এককালে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র আক্ষেপ করেছিলেন। আর আজ বাঙালীকে দুঃখ করতে হয় মুক্তিযুদ্ধের একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস ৫০ বছরেও রচিত হয়নি। সেই ত্রিশের দশকের বিপ্লবীদের স্মরণে গাওয়া গানের মতো, ‘মুক্তির মন্দিরে সোপান তলে কত প্রাণ হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে।’ বাংলাদেশের স্বাধীনতা তথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কেবলই অশ্রুজলে লেখা। তথ্য ও গবেষণাসমৃদ্ধ তেমন কোন কাজ হয়নি বলে একালের প্রজন্ম জানে না সঠিক ইতিহাস, সঠিক তথ্য। অথচ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা যাবে না বলে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে বার বার উচ্চারিত হয়। কিন্তু তাদের উপলব্ধিতে আসে না যে, ইতিহাস রচিত হয়নি বলেই বার বার বিকৃতির শিকার হচ্ছে মুুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। ইতিহাস ভুলিয়ে দেয়ার কাজটি হয়েছে দু’যুগের বেশি সময় ধরে। আর সে কারণেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ইতিহাস পৌঁছেনি। রচনার কাজ প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়ে পড়ে। পঁচাত্তর পরবর্তী সামরিক জান্তাশাসক ও তাদের উত্তরসূরিরা একদিকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার পথটি রুদ্ধ করে দিয়ে বিকৃত এক ইতিহাসকে উপস্থাপন করেছিল। তারা গণহত্যাকারী পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে হানাদার হিসেবে উচ্চারণেও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল, নানা বিভ্রান্তির বেড়াজাল ও বিভ্রমের কুয়াশায় মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও আদর্শ এবং অঙ্গীকারকে ভূলুণ্ঠিত করে পাকিস্তানী ভাবধারায় দেশকে যেভাবে ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিল, তাতে হানাদারদের দোসর যুদ্ধাপরাধীরাও সমাজ, রাজনীতিতে, ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছিল।

একাত্তরের পরাজিত শক্তিরা ক্ষমতার অলিন্দে বসে জনমত থেকে মুক্তিযুদ্ধের সবকিছু মুছে দিতে পেরেছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের হয়রানি, নির্যাতন, গ্রেফতার, গুম, হত্যা সবই চালিয়েছে সামরিক জান্তাশাসক। স্বাধীনতা পরবর্তীকালের দ্রুতগামী সময়ের প্রেক্ষাপটে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় সুনির্দিষ্ট তথ্যাবলী সংগ্রহ ও বিচার বিশ্লেষণের ক্ষেত্রগুলো নানাভাবে বিপন্ন ও বিপর্যস্ত হয়েছে। সামরিক জান্তা শাসনামলে ‘মুক্তিযোদ্ধা’ পরিচয় প্রদানও ছিল বিপজ্জনক। তাই বিস্ময়করভাবে এবং বেদনাদায়কভাবে বাঙালীর ইতিহাস রচনায় সম্ভাবনার ক্যানভাসটিকে কালিমালিপ্ত করা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের বহু দলিল দস্তাবেজ জ্ঞাত অথবা অজ্ঞাতসারে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ রাজনৈতিক দলের অবস্থান বহাল থাকায় ইতিহাস রচনার কাজ সহজসাধ্য হয়ে উঠছে না। গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধ মাত্র নয় মাসে বাংলাদেশ রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু এই নয় মাসকে সৃষ্টি করেছে আর কতদিন, কত মাস, কত বছর, তার আদ্যোপান্ত তথ্য অদ্যাবধি সংগ্রহ করা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ পূর্বাপর ইতিহাস যথাযথভাবে তুলে না আনায় প্রকৃত সত্য চাপা পড়ে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্রটি আসলেই বিশালাকার। এর বিস্তৃতি তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ছিল। বিশ্বের আর কোন স্বাধীনতা সংগ্রামে এভাবে তৃণমূল থেকে যোদ্ধা তৈরি হওয়ার ঘটনা জানা যায় না। বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক, নারী, সাধারণ গৃহস্থ, দিনমজুররাও এই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। যে কারণে পুরো মুক্তিযুদ্ধই ছিল জনযুদ্ধ। সাধারণ মানুষ, খেতে না পাওয়া মানুষও মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে সহযোগিতা করেছে তা অতুলনীয়। জনসম্পৃক্ততার সেসব ইতিহাস অপ্রকাশিতই থেকে গেছে।

সাড়ে সাত কোটি প্রাণপ্রহরী প্রদীপ হয়ে জ্বলে উঠেছিল একাত্তরে নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি আহ্বান-একটি ডাকে ও অঙ্গুলি হেলনে। ভাষা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান হয়ে একাত্তর এসেছিল জাতির জীবনে। মুক্তিযুদ্ধ হয়ে ওঠেছিল স্বপ্ন ও বাস্তবের দোলাচল। এই দোলাচল থেকে নতুন প্রজন্মকে মুক্ত করতে না পারলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শেষাবধি আত্মঅস্বীকারের চেতনায় পরিণত হওয়ার দিকেই ধাবিত হবে। পরাজিত শক্তি নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধের শুদ্ধতম ধারণাকে পর্যুদস্ত করেছে। সেই শুদ্ধতম ধারণাকে বলিষ্ঠতম কাঠামোর ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধে যারা সম্পৃক্ত ছিলেন মূলত প্রত্যক্ষভাবে আদর্শ ও অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের নানা গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা সঙ্কলিত হয়নি। ফলে মুক্তিযুদ্ধের একটি বিন্যস্ত চিত্র পাওয়া যায় না।

স্বাধীনতার পরপরই ইতিহাস রচনার কাজটি শুরু করা যায়নি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের দিকে সম্পূর্ণ দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকায়, পরবর্তীকালে হাসান হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা আন্দোলনের দলিলপত্র সংগ্রহ ও গ্রন্থভুক্ত করার কাজ চলে। তারা পনেরো খ-ে যে দলিলগুলো উপস্থাপন করেছেন, তাও সংগৃহীত তথ্যের একটি অংশমাত্র। বাকি হাজার হাজার তথ্য গায়েব হয়ে গেছে। বস্তাবন্দী সেসবের কিছু উইপোকায় কেটেছে। কয়েক বছর পরিশ্রম করে তারা যে সংগ্রহ গড়ে তুলেছিলেন, সেসব গ্রন্থভুক্ত হলে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনার কাজ এগিয়ে যেত। এই কাজের পর আসলে আর কোন কাজ হয়নি। এসব কাজ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ছাড়া করা অসম্ভব। সরকারী, বেসরকারী উদ্যোগে বা যৌথভাবে কিংবা সরকারের একক উদ্যোগেও হতে পারে ইতিহাস রচনার কাজ। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন ১৯৯৭ সালের দিকে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় মুক্তিযুদ্ধ গবেষণার কাজে বিশ্ববিদ্যালয় সম্পৃক্ত ইনস্টিটিউট গড়ার কাজটি শুরু করেছিলেন। কিন্তু, জামায়াত-বিএনপি ক্ষমতায় এসে বন্ধ করে দেয় সব কাজ। বাংলা একাডেমি জেলাভিত্তিক মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনার প্রকল্প নিয়েছিল। কিন্তু জামায়াত-বিএনপি ক্ষমতায় এসে এই প্রকল্পটিও বন্ধ করে দেয়। পরবর্তীকালে তথ্য সংগ্রাহকরা প্রকাশকদের মাধ্যমে বইগুলো প্রকাশ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পাঁচ হাজারের বেশি গ্রন্থ রয়েছে। অধিকাংশই বর্ণনা, স্মৃতিচারণ ও তথ্যের। সে অর্থে গবেষণা হয়নি খুব একটা। সবচেয়ে বড় ঘাটতি রয়েছে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধীসহ স্বাধীনতাবিরোধীদের বিষয়ে। ৫০ বছর পার হবার পরও এখন পর্যন্ত রাজাকারের পূর্ণাঙ্গ তালিকাই তৈরি হয়নি। স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বিস্তারিত ঘটনা নিয়েও বই তেমন একটা নেই। গবেষণার সুযোগ থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থনের অভাবে কাজ হচ্ছে না। যুদ্ধাপরাধী রাজাকার ও দালালদের নিয়ে গবেষণারত শাহরিয়ার কবির যেমনটা জানালেন যে স্বাধীনতার পর থেকে পাকিস্তানপন্থীরাই বেশি সময় দেশের শাসন ক্ষমমতায় থেকে ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছে। ক্ষমতায় এসে মৌলবাদী জামায়াত-বিএনপি প্রকৃত ইতিহাস মুছে ফেলে দেখাতে চেয়েছে পাকিস্তান নয়, ভারতই হলো বাংলাদেশের শত্রু। ইতিহাস না থাকায় এই অপপ্রচার এখনও চলছে।

ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যখন বর্ণিত হয়, তখন সম্মুখ যুদ্ধগুলোর ওপরই গুরুত্বারোপ করা হয়। গেরিলাযুদ্ধের প্রতি ততোটা নয়। এগারোটি সেক্টরে যে যুদ্ধ হয়েছিল অন্তিমে সেটিই হয়ে দাঁড়ায় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কাঠামো। যে ইতিহাস লেখা হয় তাতে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা থাকে অস্পষ্ট। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা ইতিহাসবিদ এবং ইতিহাস রচনা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি চ্যালেঞ্জও বটে। এই ইতিহাস রচনার পদ্ধতি কি হবে সে ব্যাপারেও কোন প্রখ্যাত প-িত এখন পর্যন্ত কোন গ্রহণযোগ্য দিকনির্দেশনা দেননি। এই ইতিহাস যথাযথভাবে তৃণমূল পর্যায়ে থেকে লিখতে হলে এবং এর অনন্য স্রষ্টা কৃষক সন্তান ও ব্রাত্যজনের ভূমিকাকে গুরুত্ব দিতে হলে ফিল্ডওয়ার্ক পদ্ধতিতে কাজ করতে হবে। ইতিহাসের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গবেষকরা এ ধরনের কাজ অদ্যাবধি করেননি। প্রয়োজন মাঠ পর্যায়ে বস্তুনিষ্ঠ অনুসন্ধান। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু রণাঙ্গনের ইতিহাস নয়। তার আরও অনেকদিক রয়েছে। সেসব উদ ঘাটনের কাজ অপর্যাপ্ত। সংবাদপত্র এ ক্ষেত্রে কিছুটা ভূমিকা পালন করে আসছে নব্বই পরবতীকাল হতে। দৈনিক জনকণ্ঠ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেছিল মুক্তিযুদ্ধের অনেক তথ্য। যার মধ্যে কুমিল্লার রসুলপুর বধ্যভূমি নিয়ে লেখা প্রকাশের পর সেখানে স্মৃতিসৌধ করা হয়। এই লেখার কাজে জড়িত সাংবাদিক ও গবেষক এবং শিশু সাহিত্যিক মোস্তফা হোসেইন জানান, তথ্য সংগ্রহ করে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচনায় সময় লাগতেই পারে। তবে যেভাবে ধীরগতিতে এবং সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত পর্যায়ে এবং সমন্বয়হীন কাজ হচ্ছে তাতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনা শেষ হবে কিনা সে নিয়ে সংশয় রয়েছে। একাত্তরের প্রজন্ম ক্ষয়িষ্ণু হওয়ার কারণে এবং অনেকে মৃত্যুবরণ করায় তথ্য সংগ্রহের কাজ দুরূহ হয়ে পড়ছে। যারা বেঁচে আছেন, তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ দ্রুত করা জরুরী হয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকতার অভাবে তা করা যাচ্ছে না। অনেক দলিলপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের স্মারকও। মুজিবনগর সরকারের অনেক দলিলপত্র যুদ্ধ শেষে দেশে আনা হয়নি। সামরিক বাহিনীর কোন দলিলও বেসামরিক হাতে দেয়া হয়নি। প্রতিশ্রুতি থাকলেও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক আফসান চৌধুরী শংকিত যে, ইতিহাস চর্চার যে সম্পদ বা রসদ লাগে তার অন্তিমলগ্নে এসে দাঁড়িয়েছি আমরা। এরপর আলোচনা হতে পারে। বিশ্লেষণ হতে পারে। কিন্তু মৌলিক ইতিহাস গবেষণা সম্ভব নাও হতে পারে। আজকের প্রজন্মের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর ইতিহাসের কিছুই জানে না। জানার সুযোগও নেই। শুধু সাতই মার্চের ভাষণ শুনে একটা কাঠামো হয়ত তারা দাঁড় করায়। আমাদের সৌভাগ্য যে, ওই ভাষণে পাকিস্তানের চব্বিশ বছরের ইতিহাসের রূপরেখা পাওয়া যায়। কিন্তু এত বিশাল মুক্তিযুদ্ধের অনেক দিকই তাদের অজানা। যে কারণে একাত্তরের দালাল, রাজাকাররা জনজীবনে মিশে যেতে পারছে। তাদের নামে স্থাপনা হচ্ছে। পরাজিত শক্তিরা মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম ওঠাতে পারছে।

পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস যদি থাকত, তবে বিকৃত ইতিহাস তৈরির কাজটি বিএনপি-জামায়াতসহ পরাজিত শক্তিরা করতে পারত না। এমনকি অনেক বিষয় বিদেশী সাংবাদিকরাও অযাচিত মতামত ও মন্তব্য পেশ করতে পারত না। এখন আসি মুল বিষয়েঃ

বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে বাংলাদেশ হতো না
পঁচাত্তর থেকে দুই হাজার সতেরো। দীর্ঘ ৪২ বছর পার হয়ে গেছে এদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ছাড়া! ইতিহাসের স্রষ্টা আজ নিজেই এক বিমূর্ত ইতিহাস। চার দশকেরও বেশী সময় ধরে তিনি চির নিদ্রায় শুয়ে আছেন কবরে। সারাজীবন যার কেটেছে ঘাত-প্রতিঘাত, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং লক্ষ জনতার ধ্বনি প্রতিধ্বনি উত্তাপ উত্তেজনার মধ্যে। আজ তাঁর চারপাশে শুধুই নিস্তবদ্ধতার শিকলে আটকানো। লোকচক্ষুর অন্তরালে তিনি আজ চির নিদ্রায় শায়িত। পাখিরা তাকে ঘুমের গান শোনায়,। চার দশক আগে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট বঙ্গবন্ধু স্বপরিবারে নিহত হয়েছেন। এক সুগভীর আন্তর্জাতিক চক্রান্তে। সেই পিতৃঘাতী-নারীঘাতী-শিশুঘাতী বর্বরতার কলংকিত স্মৃতি নিয়ে চল্লিশ বছর ধরে বর্ষার সজল ছায়ায় বিষন্ন ১৫ আগষ্ট ফিরে ফিরে আসে, আবার চলে যায়। আর নীরব ভাষায় বলে যায় বাঙালী জাতির ইতিহাসে সবচাইতে কলঙ্কজনক হত্যা-কান্ডের লোমহর্ষক কাহিনী।

চল্লিশ বছর ধরে বঙ্গবন্ধু অস্তিত্বহীন উপস্থিতিহীন শুধুই একস্মৃতি। স্বাধীন বাংলার প্রতিষ্ঠাতার মরদেহ বাংলার মাটিতে মিশে গেছে। তাঁর সেই বজ্রকন্ঠের উদাত্ত আহবান মুক্তিকামী বাঙালীর প্রাণে প্রাণে বিপ্লবের আগুন ছড়িয়ে দিতো, সেই কণ্ঠ আজ চিরতরে স্তব্ধ! পাজামা-পাঞ্জাবী, মুজিব কোট পরিহিত সেই জনমন অধিনায়ক আর কোনদিন শোষিত, বঞ্চিত লক্ষ জনতার সামনে দাঁড়িয়ে বলবেন না ‘ভাইয়েরা বোনেরা জাগো’ টঙ্গিপাড়ার এক পল্লীগৃহ থেকে টিনের চোংগা হাতে পথে পথে বেড়িয়ে সারা বাংলায় চারণের মতো ঘুরে ঘুরে যিনি বাঙালিকে জাগরণের মুক্তির মন্ত্র শুনিয়েছেন, সারা জীবনের সাধনায় যিনি বাঙালী জাতিকে জাগিয়ে তুলেছেন, বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন এবং মাত্র সাড়ে তিন বছর দেশ শাসনের পর গুলীবিদ্ধ লাশ হয়ে আবার সেই টুঙ্গিপাড়াতেই ফিরে গেছেন। ইতিহাসের সেই মহান রাজা আর কোনদিন গণশত্রুদের দুর্গে কাঁপন ধরিয়ে বলবেন না ‘আমি শোষকের গণতন্ত্র চাইনা-শোষিতের গণতন্ত্র চাই, আমি চাই দুঃখি মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে’।

বঙ্গবন্ধু না থাকলেও বছরের পর বছর ধরে দেশের রাজনৈতিক স্রোতধারা বহুলাংশে তাঁকেই কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। রাজনৈতিক দিগন্তে উত্তাপ-উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর আদর্শ রক্ষা ও ধ্বংসের তীব্র প্রতিযোগিতায় একদিকে চলছে তাঁর চরিত্র হনন ও ভাবমুর্তি ম্লান করার পরিকল্পিত প্রচেষ্টা, অন্যদিকে চলছে এই অপঃপ্রয়াস প্রতিহত করার সংগ্রাম।

সারা জীবনের সাধনা ও দুঃখের তপস্যা নিয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে স্বাধীন করে গেছেন। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁকে সাড়ে তিন বছরের বেশী বাঁচতে দেওয়া হয়নি। মৃত্যুর পরও তাঁকে নিয়ে টানা হ্যাচড়া কম হয়নি। শুধু উপেক্ষা আর অবহেলাই নয়, শাসনতান্ত্রিকভাবে জাতির জনক হিসেবে স্বীকৃতি অক্ষুন্ন থাকা সত্বেও বঙ্গবন্ধুকে নিষিদ্ধ এবং নির্বাসিত করার চেষ্টা চলেছে। গত চার দশকে রাষ্ট্রনায়কদের মধ্যে একমাত্র বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ছাড়া আর কেউ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামের আগে ‘বঙ্গবন্ধু’ কথাটি ব্যবহার করেননি এবং তাঁর কবর জেয়ারত করে সেখানে রুহের মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করেননি। বঙ্গবন্ধুর এককালের ঘনিষ্ট সহকর্মী খন্দকার মেশতাক প্রেসিডেন্ট থাকাকালে এক আদেশ জারি করে মুজিব হত্যার বিচারের পথ রুদ্ধ করে দিয়ে গেছেন। আর জিয়ার আমলে প্রকারান্তরে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ নিষিদ্ধ করা ছাড়াও মোশতাকের সেই আদেশটি সংবিধানের অর্ন্তভূক্ত করা হয়েছে; কিন্তু তা সত্বেও জাতীয় রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর নাম নানাভাবে এসেছে এবং আসছে। মৃত বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক অস্তিত্ব আজো বড় বেশী জীবন্ত। এরমধ্য দিয়ে এটাই প্রতীয়মান হয় যে বঙ্গবন্ধু নিহত হলেও রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা যায়নি। বঙ্গবন্ধুকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে না পেরে কূচক্রিরা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতা থেকে, পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তাদের মীরজাফরী চক্রান্তে ক্ষমতা থেকে অপসারিত হলেও বঙ্গবন্ধু স্থায়ী আসন লাভ করেছেন ইতিহাসের অমরত্বে।

আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম। আন্দোলনের মধ্যদিয়েই তাঁর নেতৃত্বের বিকাশ ও প্রতিষ্ঠা। ১৯৩৮ সালে যখন বৃটিশ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে সর্বপ্রথম গ্রেফতার হন তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। সেদিন হয়তো তিনি নিজেও ভাবতে পারেননি যে, কালে কালে কারাগারই হয়ে উঠবে তাঁর ‘সেকেন্ড হোম’। জীবনের এক যুগের বেশী সময় কাটবে তাঁর জেলে জেলে আর একদিন এই বাংলাদেশে ‘শেখ মুজিব’ হয়ে উঠবে সংগ্রামের আরেক নাম, বাঙালীর আত্মচেতনার প্রতীক। ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বর মাসের কনকনে শীতের স্তব্ধ রাত্রি। ঢাকা সেন্ট্রাল জেলের এক নিভৃত সেলে ঘুমন্ত রাজবন্দী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ডেকে তুললেন জেলের কর্মকর্তারা আর বললেন, স্যার, আপনার রিলিজ অর্ডার হয়ে গেছে। আপনি মুক্ত। দয়া করে তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে নিন’। তিনি তখন কারাগারে বন্দি ছয় দফা দাবী তোলার অপরাধে। মোনেম খান সদম্ভে বলেছিলেন আমি যতদিন গভর্ণর আছি শেখ মুজিবকে দিনেরপর দিন আলো দেখতে দেবো না, জেলের অন্ধ কুঠিরেই তাকে পঁচে মরতে হবে’। বঙ্গবন্ধুর সেইসব কথা মনে পড়লো তাই এই আকস্মিক রিলিজ অর্ডারের কথা শুনে অবাক না হয়ে পারলেন না। তবু শেষ পর্যন্ত কিছুটা দ্বিধা, কিছুটা বিভ্রান্তি নিয়েই তিনি ধীরে পদক্ষেপে জেল গেটের বাইরে এসে দাঁড়ালেন। আর মুহুর্তের মধ্যেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেলো। দেশদ্রোহিতার অভিযোগে আবার গ্রেফতার হলেন। এবার আর পুলিশের হাতে নয় সেনাবাহিনীর হাতে। নিস্তব্ধ গভীর রাতে সেন্ট্রাল জেল থেকে কোথায় নিয়ে যাবে তাঁকে? ক্যান্টনমেন্ট, না একেবারে পশ্চিম পাকিস্তানে। কি আছে ভাগ্যে তখনো কিছুই জানতেন না বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ক্ষণিকের জন্য তিনি আনমান হয়ে গেলেন। একবার চোখ তুলে চাইলেন নক্ষত্র-খচিত আকাশের দিকে। পরমুহুর্তেই নিচু হয়ে জেল গেট থেকে তুলে নিলেন জননী বাংলার এক মুঠো ধুলোমাটি। অনিরুদ্ধ প্রবাল আবেগে সেই দেশের মাটি কপালে ঠেকিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান উচ্চারণ করলেন অন্তরের প্রার্থনা ‘আমার এই দেশেতে জন্ম যেন এই দেশেতে মরি’। (আমির হোসেন, সাপ্তাহিক ছুটি, আগষ্ট ১৮৮৫)।

আশ্চর্য ট্র্যাজিক নাটকীয়তায় পূর্ণ হয়েছে তাঁর সেই প্রার্থনা। তাঁর দেশেতে জন্ম এবং তিনি এই দেশেই মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু কি মর্মান্তিক মৃত্যু! ভেবে অবাক হতে হয়, দুই দুইবার বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কব্জা থেকে জীবন নিয়ে ফিরে এসেছেন, কিন্তু স্বদেশী ঘাতকরা তাঁকে রেহাই দেয়নি। উপনেবেশবাদী পাকিস্তানের থেকে স্বাধিকার এমনকি স্বাধীনতা আদায় করতে গিয়ে তাঁকে জীবন দিতে হয়নি। অথচ নিজের দেশের ভাড়াটিয়া খুনীদের হাতে জীবন দিতে হয়েছে ‘শোষিতের গণতন্ত্র’ ও ‘অর্থনৈতিক মুক্তির’ কথা বলতে গিয়ে।

পঁচাত্তারের ১৫ আগষ্ট সন্ধ্যায় বিবিসির ভাষ্যকার যথার্থই বলেছেন ‘বাংলাদেশে যা কিছুই ঘটুক না কেন, শেখ মুজিবুর রহমান চির স্মরনীয় হয়ে থাকবেন সেই মানুষটি হিসেবে; যিনি না হলে বাংলাদেশের জন্মই হতো না’। জুলিয়াস সিজারের মৃত্যুর পর রোম সম্রাজ্যের বিশৃঙ্খল অবস্থার বর্ণনা করতে গিয়ে শেক্সপিয়ার লিখেছেন, ‘দেশবাসী অনুতাপ কর’ বঙ্গবন্ধুবিহীণ বাংলায় বাঙালির বোধদয় এখন অনুতাপ করার সময়।

লেখক: সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও সদস্য সচিব, আয়ারল্যান্ড আওয়ামী লীগ।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে