প্রকৌশলী মো. আলীমুজ্জামান চৌধুরীঃ বর্তমানে দেশে প্রায় ৮.২১ লাখ হেক্টর বদ্ধ ও আধা-বদ্ধ জলাশয় রয়েছে যার মধ্যে বিপুলসংখ্যক খাস পুকুর, দীঘি, বদ্ধ খাল, মরানদী, বাঁওড়, বিল ও বরোপিট পতিত অবস্থায় রয়েছে এবং মনুষ্যসৃষ্ট বহুবিধ কারণে প্রতিনিয়ত ভরাট/পতিত জলাশয়ের পরিমাণ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে; যা পর্যায়ক্রমে পুনর্খননের মাধ্যমে মৎস্যচাষের আওতায় এনে গ্রামীণ পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ অতিরিক্ত মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা সম্ভব।

দেশের ভরাট জলাশয় পুনর্খননের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব
আমাদের বাংলাদেশে এক সময়ে প্রাকৃতিক নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড় ইত্যাদি জলাশয় ছিল নানা প্রকৃতির দেশীয় মাছের প্রধান আবাসস্থল। দেশের মোট অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ৯০% মৎস্য আহরিত হতো এ সব জলাশয় হতে। ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বসতি স্থাপন, নগরায়ণ, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিল্পের প্রসার, কৃষির আধুনিকায়নে ভূগর্ভস্থ পানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার এবং মনুষ্যসৃষ্ট বহুবিধ কারণে এ সব প্রাকৃতিক জলাভূমি একদিকে যেমন দারুনভাবে সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে ওই জলাভূমি থেকে উৎপাদন বহুলাংশে কমেছে। ফলে বর্ধিত চাহিদা জোগান দিচ্ছে চাষকৃত মাছ এবং এ ধারা অব্যাহত আছে। বর্তমান বাজার মূল্য এবং পুষ্টিকর খাদ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে মৎস্যচাষ একটি লাভজনক পেশা হিসেবে পরিগণিত হওয়ায় ইদানীং ব্যক্তি পর্যায়ে কৃষি জমি রূপান্তরের মাধ্যমে অসংখ্য আধুনিক বাণিজ্যিকভাবে মৎস্য খামার গড়ে উঠছে। ফলে বর্তমানে কৃষি ফসলের সঙ্গে মৎস্যচাষের একটি প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে সময় এসেছে সারা দেশের ভরাট হয়ে যাওয়া অসংখ্য পতিত সরকারি খাস জলাশয়গুলো (পুকুর/দীঘি/মরানদী/বরোপিট/বিল/হাওড় ইত্যাদি) প্রয়োজনীয় পুনর্খননের মাধ্যমে পানি ধারণক্ষমতা বাড়িয়ে সারা বছর প্রযুক্তিনির্ভর মৎস্য উৎপাদন কার্যক্রমের আওতায় আনা। এর ফলে একদিকে যেমন অব্যবহৃত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির কারণে জলাশয়গুলোর ইজারা মূল্য বৃদ্ধির ফলে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে। এ ছাড়া উন্নয়নকৃত জলাশয়ের নির্মিত পাড়ে বিকল্প কর্মসংস্থান হিসাবে ফলজ বৃক্ষরোপণসহ নানা ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ সম্ভব হবে এবং পরিবেশের উন্নয়ন ও পার্শ্ববর্তী কৃষিকাজে সেচ ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার, রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) ও ডেল্টা পস্ন্যান ২১০০-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসাবে মৎস্য সেক্টরকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। বৈষয়িক করোনাভাইরাস উত্তর বাংলাদেশে পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য সরবরাহ ও গ্রামপর্যায়ে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বর্তমান সরকারের মূল নির্দেশনা হলো ‘দেশের প্রতি ইঞ্চি জমি পতিত না রেখে উৎপাদনশীল কাজে লাগাতে হবে’। অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের অংশ হিসাবে মৎস্য অধিদপ্তরাধীন অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি শীর্ষক’ প্রকল্পটি মোট ৪০৯.০০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে অক্টোবর/২০১৫ থেকে জুন/২০২২ মেয়াদে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্প মেয়াদে সারা দেশের ৬১টি জেলার (৩ পার্বত্য জেলা ছাড়া) ৩৪৯টি উপজেলার মোট ২,৫৯৭.৪৩ হেক্টর আয়তনের তালিকাভুক্ত পতিত/অব্যবহৃত বিভিন্ন শ্রেণির জলাশয় পুনর্খননের মাধ্যমে মৎস্যচাষ উপযোগী করে সংস্কার করা হবে, ফলে প্রকল্প মেয়াদ শেষে মোট ১০,২৩৪.০০ মেট্রিক টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদনসহ ১৮,১৮২ জন মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ইতিমধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত প্রায় ১২৮১.০ হেক্টর জলাশয় পুনর্খনন করা হয়েছে। খননকৃত জলাশয়ের মোট ১০৬০০ জন সুফলভোগীকে সংগঠিত করে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব মাছচাষের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। উন্নয়নকৃত জলাশয় থেকে বর্তমানে বাৎসরিক ৬,৮০১.০ মেট্রিক টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদনসহ (৫.০ মে.টন/হেক্টর/বছর) এবং ৮,৭০৯ জন মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে (প্রতি হেক্টরে ৭ জন)। উৎপাদিত মাছের বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১০২.০০ কোটি টাকা। (১৫০/- টাকা প্রতি কেজি)। এ ছাড়া পরোক্ষভাবে আরও দ্বিগুণেরও বেশি পরিমাণ মানুষ আর্থিকভাবে উপকৃত হচ্ছে। দেশব্যাপী ইতিমধ্যেই চলমান এ প্রকল্পটি মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়েছে। ফলে প্রতিনিয়ত সরকারি খাস পতিত/ভরাট জলাশয় পুনর্খননের মাধ্যমে মৎস্যচাষের আওতায় আনার চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

উল্লেখ্য, বর্তমানে দেশে প্রায় ৮.২১ লাখ হেক্টর বদ্ধ ও আধা-বদ্ধ জলাশয় রয়েছে যার মধ্যে বিপুলসংখ্যক খাস পুকুর, দীঘি, বদ্ধ খাল, মরানদী, বাঁওড়, বিল ও বরোপিট পতিত অবস্থায় রয়েছে এবং মনুষ্যসৃষ্ট বহুবিধ কারণে প্রতিনিয়ত ভরাট/পতিত জলাশয়ের পরিমাণ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে; যা পর্যায়ক্রমে পুনর্খননের মাধ্যমে মৎস্যচাষের আওতায় এনে গ্রামীণ পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ অতিরিক্ত মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা সম্ভব।

গুরুত্ব অনুধাবন করে বর্তমান সরকার বিগত ২১/০৭/২০২০ তারিখের একনেক সভায় সিদ্ধান্ত হয় ‘কোভিড-১৯ উত্তর বাংলাদেশে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি অব্যাহত রাখা ও গ্রামীণ পর্যায়ে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সারা দেশের ভরাট হয়ে যাওয়া সব শ্রেণির পতিত জলাশয়গুলো মৎস্যচাষ উপযোগী পুনর্খনন/সংস্কারের জন্য বৃহত্তর পরিসরে প্রকল্প গ্রহণের। সে লক্ষ্যে মৎস্য অধিদপ্তর ইতিমধ্যে প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ প্রণয়নের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।

কিছু প্রশ্নমালা এবং জবাব:

০১. প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ও গৃহিত কার্যক্রমসহ বর্তমান অবস্থা।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য সারা দেশের ভরাট হয়ে যাওয়া অসংখ্য পতিত সরকারি খাস ও প্রাতিষ্ঠানিক জলাশয়গুলো (পুকুর/দীঘি/মরানদী/বরোপিট/বিল/হাওড় ইত্যাদি) প্রয়োজনীয় পুনর্খননের মাধ্যমে সারা বছর প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন কার্যক্রমের আওতায় আনার মাধ্যমে গ্রামীণ পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা, সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা, সুফলভোগীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের উন্নয়ন করা।

উক্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য মৎস্য অধিদপ্তরের অধীন ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি শীর্ষক’ প্রকল্পটি (দ্বিতীয় সংশোধিত) মোট ৪০৯.০০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে অক্টোবর/২০১৫ থেকে জুন/২০২২ মেয়াদে বাস্তবায়িত হচ্ছে।

০২. পুনর্খননের মাধ্যমে মাছচাষ উপযোগী জলাশয় তৈরি এবং বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা।

দেশের মানুষের পুষ্টিমান সম্পন্ন খাদ্যের বড় অংশ আসে মৎস্য সেক্টর থেকে। ফলে প্রতিনিয়ত ভরাট হয়ে যাওয়া জলাশয়গুলো পুনর্খনন/সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন অব্যাহত রাখা এবং বর্ধিত চাহিদার জোগান দেওয়া মৎস্য অধিদপ্তরের অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রমের অংশ।

বর্তমানে দেশে প্রায় ৮.২১ লাখ হেক্টর বদ্ধ ও আধা-বদ্ধ জলাশয় রয়েছে যার মধ্যে বিপুল সংখ্যক খাস পুকুর, দীঘি, বদ্ধ খাল, মরানদী, বাঁওড়, বিল ও বরোপিট পতিত অবস্থায় আছে যা পর্যায়ক্রমে পুনর্খননের মাধ্যমে মাছচাষের আওতায় এনে গ্রামীণ পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ অতিরিক্ত মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা সম্ভব।

০৩. দেশের ভরাট হয়ে যাওয়া জলাশয়গুলো দখলের প্রবণতা রয়েছে, প্রবণতা রোধ করার উপায়।

মূলত জনসংখ্যার চাপ এবং প্রতিনিয়ত সরকারি জলাশয় সংলগ্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গাগুলো ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ, শিল্প স্থাপন, নগরায়ণ, রাস্তা নির্মাণসহ প্রতি বছর বন্যাবাহিত বিপুল পরিমাণ পলিমাটি জমার কারণে একসময়ের বছরব্যাপী পানিতে ভরা প্রাকৃতিক মাছের বিচরণক্ষেত্র নদী-নালার গভীরতা কমে যাচ্ছে এবং সংকুচিত হচ্ছে। বর্তমানে বর্ষাকালে ওইসব জলাশয়গুলোতে পানি থাকলেও গভীরতার অভাবে শুষ্ক মৌসুমে শুকিয়ে যায়, এসব ভরাট হয়ে যাওয়া সরকারি জলাশয়গুলো স্বার্থলোভী মানুষের অবৈধ দখলে চলে যাচ্ছে, ফলে একদিকে ধারণক্ষমতার অভাব অন্যদিকে দ্রম্নত পানি নিষ্কাশন/নেমে যাওয়ার অভাবে অল্প বর্ষাতেই লোকালয় পস্নাবিত হচ্ছে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

দেশের অভ্যন্তরীণ ভরাট হয়ে যাওয়া বদ্ধ জলাশয়গুলো পুনর্খননের আওতায় এনে উপযুক্ত গভীরতার পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়িয়ে দিতে হবে, প্রবাহমান বড় বড় নদীগুলোর সঙ্গে ভরাট হয়ে যাওয়া সংযোগ খাল/শাখা নদীগুলো খনন করে পানিপ্রবাহ সচল রাখতে হবে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং বসতবাড়ি নির্মাণ কঠোর আইন করে বন্ধ করতে হবে। এতে মৎস্য সম্পদের উন্নয়ন ও জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের উন্নয়ন ঘটবে, গ্রামভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হবে এবং আধুনিক কৃষিকাজে ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার নিশ্চিত করে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে হবে। অন্যদিকে সরকারি জলাশয়গুলোর সীমানা নির্ধারণ করা হলে অবৈধ দখল প্রক্রিয়া বন্ধ করা সম্ভব হবে।

০৪. ভরাট জলাশয় পুনর্খননের মাধ্যমে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির চলমান প্রকল্পটি সুফল।

মোট ৪০৯.০০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে অক্টোবর/২০১৫ থেকে জুন/২০২২ মেয়াদে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি শীর্ষক’ প্রকল্পটি নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের পথে সঠিকভাবে এগিয়ে চলেছে। জুন/২০২০ পর্যন্ত প্রায় ১৩০০.০ হেক্টর জলাশয় পুনর্খনন করে গঠিত সুফলভোগীদের মাধ্যমে মৎস্যচাষের আওতায় আনা হয়েছে। উন্নয়নকৃত জলাশয় থেকে বর্তমানে বাৎসরিক প্রায় ৬,৮০০.০ মেট্রিক টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদনসহ (৫.০ মে.টন/হেক্টর/বছর) প্রায় ৮,৭০৯ জন মানুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং পরোক্ষভাবে আরও দ্বিগুণ পরিমাণ মানুষ উপকৃত হচ্ছে (প্রতি হেক্টরে ৭ জন)। বর্তমান ও আগামী বছরের মধ্যে অবশিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।

০৫. মৎস্য অধিদপ্তর ও প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় কর্তৃক জনকল্যাণমুখী প্রকল্প প্রণয়নের পরিকল্পনা।

বিষয়টি সম্পূর্ণ নীতিনির্ধারণী বিষয় হওয়ায় এর উপযুক্ত জবাব দিতে পারবেন সংস্থা প্রধান হিসাবে মহাপরিচালক মৎস্য অধিদপ্তর মহোদয় এবং সচিব মহোদয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। তবে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলব দেশের কৃষি সেক্টরের মধ্যে আমাদের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন অধিদপ্তরগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি জনকল্যাণমুখী, বিশেষ করে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিবেচনায়। আমি মনে করি সম্ভাবনাময় খাত হিসাবে মৎস্য সেক্টরের মাধ্যমে ভবিষ্যতের বর্ধিত চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় মৎস্য অধিদপ্তর জনকল্যাণমুখী বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতে নেবে।

০৬. মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি ও বিশ্বে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান।

সম্প্রতি এফএওর প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির হারে ইন্দোনেশিয়ার পরই দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। এটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক অনুভূতি এবং এ অভাবনীয় কৃতিত্বের দাবিদার বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার তথা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঠিক দিকনির্দেশনার আলোকে মৎস্য অধিদপ্তরের।

নিশ্চয়ই চালিকাশক্তি হিসাবে মৎস্য অধিদপ্তরের অন্যান্য উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে বর্ধিত মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও গ্রামভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আমার প্রকল্পের ভূমিকা অত্যন্ত জোরালো। বর্তমান বৈষয়িক করোনাভাইরাসের কারণে কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতি মোকাবেলায় দেশে পুষ্টিমানসম্পন্ন খাদ্য সরবরাহ ও গ্রামপর্যায়ে ব্যাপকভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সারা দেশের ভরাট হয়ে যাওয়া সব শ্রেণির পতিত জলাশয়গুলো মৎস্য চাষ উপযোগী করে পুনর্খনন/সংস্কারের জন্য চলমান জলাশয় সংস্কার প্রকল্পের অনুরূপ বৃহত্তর পরিসরে প্রকল্প গ্রহণের প্রয়োজন এবং সে লক্ষ্যে ইতিমধ্যে প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ প্রণয়নের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।

০৭. মুজিব বর্ষ উপলক্ষে মৎস্য অধিদপ্তর বিশেষ পদক্ষেপ।

মুজিব বর্ষকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় মৎস্য অধিদপ্তর সারা দেশব্যাপী উন্নয়নমূলক দৃশ্যমান নানাবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করেছে এবং ওই কার্যক্রমকে বেগবান করার জন্য সব চলমান প্রকল্পের অনুমোদিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এর সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। ওই কার্যক্রমের অধীনে নেত্রকোনা ও শরিয়তপুর জেলার দুটি গ্রামকে মৎস্যগ্রাম হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে, যে গ্রামের সব জলাশয় প্রযুক্তিনির্ভর মৎস্যচাষের আওতায় আনা হবে এবং অন্যান্য দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে সেনিটারি, বিদু্যৎ, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, শিক্ষাসহ সব সামাজিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে গ্রাম দুটিকে মডেল গ্রামে রূপান্তর করা হবে।

০৮. বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর হতে চলেছে। এ ক্ষেত্রে মৎস্য অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে কি কি প্রণয়ন করছে।

এক কথায় বলা যায় স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দীর্ঘ ৫০ বছরে মৎস্য অধিদপ্তর চাহিদার সঙ্গে মিল রেখে কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে আজকে যে অবস্থানে উপনীত হয়েছে তাতে আমার চলমান প্রকল্পের অনুরূপ অসংখ্য সমাপ্ত প্রকল্পের বড় ধরনের অবদান রয়েছে। যতটুকু পরিসংখ্যান থেকে জেনেছি স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের আগে পর্যন্ত দেশে মৎস্যচাষ প্রবর্তনই হয়নি। দেশের নদী/নালা/খাল/বিল/হাওড়/বাঁওড় প্রভৃতি প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে আহরিত মাছই একমাত্র প্রধান সরবরাহ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী চিন্তার ফসল হিসেবে ১৯৭৩ সালে গণভবনের লেকে মাছের পোনা অবমুক্তির মাধ্যমে আধুনিক মাছচাষের সূচনা হয়, যা আজকের দিনে মাছচাষ একটি অত্যন্ত লাভজনক পেশা ও শিল্প হিসাবে মানুষ গ্রহণ করেছে। এর ফলে বিশ্বে বাংলাদেশ আজ মাছচাষে দ্বিতীয় এবং একনম্বর অবস্থানের চেষ্টায় সব কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। যেমন (ক) বিশ্বে রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আরও বেশি আয়ের জন্য প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ভেলু্য অ্যাড করা হচ্ছে, (খ) জাতীয় মাছ ইলিশ সংরক্ষণে নদীতে ও সাগরে নানা কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, (গ) অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছের মজুত বাড়ানোর জন্য প্রতি বছর সারা দেশব্যাপী রাজস্ব খাতের অর্থায়নে মাছের পোনা অবমুক্ত করা হচ্ছে, (ঘ) সাগরের সামুদ্রিক মাছের মজুত গ্রহণযোগ্য মাত্রায় রেখে আহরণ বৃদ্ধিও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, (ঙ) ভরাট হয়ে যাওয়া সব জলাশয় পর্যায়ক্রমে খননের আওতায় এনে উৎপাদন বৃদ্ধির প্রচেষ্টা নেওয়া হচ্ছে।

লেখক: প্রকল্প পরিচালক, জলাশয় সংস্কারের মাধ্যমে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প, মৎস্য অধিদপ্তর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে