ছবি: সংগৃহিত

টাচ নিউজ ডেস্ক: জীবন আর সংগ্রাম আলাদা কিছু নয় মো. মাসুদের কাছে। দুটি শব্দ যেন সমার্থক। ছেলেবেলায় বাবাকে হারানোর পর ঢাকায় এসে নানা কাজই করেছেন তিনি। শেষমেশ যে কাজে থিতু হতে চেয়েছিলেন, কোভিডের কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। এখন শক্তসমর্থ হাতে রিকশার হাতল ধরেছেন। তাতে অবশ্য এই ঘোর দুর্দিনে খারাপ যাচ্ছে না তাঁর।

বয়স ২৫-২৭ হবে মো. মাসুদের। আট বছর আগে জীবিকার সন্ধানে আরও লাখ লাখ তরুণের মতো তিনিও সুনামগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসেন। গুলশানে এক ধনাঢ্য ব্যক্তির সন্তানকে বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়ার কাজ করতেন প্রথমে। এরপর কাজ করেন গ্যাসের চুলার মিস্ত্রি হিসেবে। সে জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণও পেয়েছেন। টানা পাঁচ বছর কাজ করেন এক দোকানে। তখন ভেবেছিলেন, কিছু টাকা জোগাড় করে নিজেই এলপি গ্যাসের সাবডিলার হবেন। চুলা সারাইয়ের কাজ তো জানাই আছে। ফলে দুটি মিলিয়ে তাঁর ভালোই চলে যাবে, এমন স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। কিন্তু গত বছর কোভিড সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে সেই স্বপ্ন আর বাস্তবায়িত হয়নি তাঁর।

২০২০ সালের মার্চের শেষ দিকে বাড়ি চলে যান মাসুদ। টানা চার মাস বাড়িতে কাটিয়ে শেষমেশ গ্রাম থেকেই বাড়িভাড়ার টাকা নিয়ে ফেরেন তিনি। কিন্তু বিধি বাম। ভোরবেলা বাস থেকে নেমে বাড্ডায় বাসায় যাওয়ার সময় রামপুরা সেতুতে ছিনতাইয়ের শিকার হন। তাঁর ভাষায়, ‘বিশ্বাস করবেন না ভাই, ভদ্রলোক ছিনতাইকারী। দেইখা মনেই হয় নাই যে ছিনতাইকারী হইতে পারে। অটোরিকশা থামানোর কথা বললে ভাবছিলাম, সিভিল ড্রেসে পুলিশ হইব।’ ফলে জীবন আরও কঠিন হয়ে যায় তাঁর।

এই তরুণ বলেন, এবার এপ্রিলে সরকার কঠোর বিধিনিষেধ শুরু করলে আবার বিপদে পড়েন তিনি। ছেলেবেলায় বাড়ির পাশে রিকশা গ্যারেজে রিকশা চালানো শিখেছিলেন, সেই বিদ্যা কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন এবার। সকাল-সন্ধ্যা দুই বেলা রিকশা চালাতে শুরু করেন তিনি। তাতে এখন রোজগার কেমন হয়, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সকালে ৭০০ টাকা হইছে আর আপনারে দিয়্যা সন্ধ্যায় ৪০০ টাকা হব।’ অর্থাৎ সব মিলিয়ে এখন তাঁর হাজার টাকার ওপরে থাকছে। এতে সংসার ভালোই চলে যাচ্ছে বলেই জানালেন তিনি। বাড়িতেও মাকে টাকা পাঠাচ্ছেন। ছোট ভাই উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে এবার। তার খরচও মাসুদকে দিতে হয়। বলেন, ‘দিনের বেলা রিকশা চালাই নিজের ওয়াইফ-বাচ্চার জন্য, আর সন্ধ্যায় চালাই মা-ভাইয়ের জন্য।’ যদিও তাঁর আক্ষেপ, ভাই বিয়ে করলেই আর খোঁজখবর রাখবে না।

এই জীবনে অভিজ্ঞতাও নিছক কম হয়নি তাঁর। গ্যাসের চুলার কাজ করার সময় একবার গুলশানের এক বাসায় সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে প্রশিক্ষণলদ্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে, তা বন্ধ করেন তিনি। বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন তিনি সেদিন। তবে এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যায় সেই পরিবার। তারপর থেকে সেই পরিবারের সঙ্গে সখ্য হয়ে যায় তাঁর। সেই ব্যক্তি তাঁকে নানাভাবে সাহায্য করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু মাসুদের কথা হলো, ‘টাকায় সম্পর্ক নষ্ট হয়।’ এমনকি সেই ব্যক্তি তাঁকে এলপি গ্যাসের ব্যবসা শুরু করার জন্য এক লাখ টাকা অনুদান হিসেবেও দিতে চেয়েছেন। কিন্তু সেই প্রস্তাবে রাজি হননি মাসুদ। তাঁর সেই এক কথা, টাকায় সম্পর্ক নষ্ট হয়। তারপরও সেই ব্যক্তি ঈদের মধ্যে তাঁকে ১০ হাজার টাকা বিকাশ করেছেন। সেই টাকা দিয়ে অবশ্য ভাই, মা ও স্ত্রীকে কাপড় কিনে দিয়েছেন তিনি। আর আছে মাত্র এক হাজার টাকা।

তবে স্বপ্নের কাছাকাছি চলে এসেছেন মো. মাসুদ। তাঁর মা নানা চেষ্টাচরিত্র করে এক লাখ টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করছেন। সেই টাকা জোগাড় হয়ে গেলেই এলপি গ্যাসের সাবডিলারশিপের ব্যবসা শুরু করে দেবেন এই উদ্যমী তরুণ।

খবর: প্রথম আলো

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে