ড. মোঃ শাহকামাল খানঃ বরেণ্য কৃষিবিদ বর্ষিয়ান জননেতা বদিউজ্জামান বাদশা নবীন প্রবীণ সকল কৃষিবিদদের আপনজন, আত্মার-আত্মীয়, সকলের মনের মণিকোঠায় স্থান পাওয়া এক বিশেষ ব্যক্তিত্ব, কৃষিবিদজগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

১৯৫৮ সালের ৫ জানুয়ারি শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে কৃষিবিদ বদিউজ্জামান বাদশার জন্ম। মেধাবী ছাত্র বদিউজ্জামান বাদশা ১৯৭৪ সালে ৫টি লেটারসহ এসএসসি পাস করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে তিনি বঙ্গবন্ধু পুত্র শেখ জামালের সহপাঠী ছিলেন। কিন্তু তিনি কখনো শেখ জামালের সহপাঠী পরিচয়ে প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে বিশেষ সুবিধা নেননি বা নেওয়ার চেষ্টা করেননি এই বিশাল মনের অধিকারী ত্যাগি নেতা। তিনি এইচএসসি পাশকরে সিলেট মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। মেধাবী ছাত্র বদিউজ্জামান বাদশা মেডিকেল কলেজ ছেড়ে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েও তা প্রত্যাক্ষান করে বাংলাদেশের কৃষি ও কৃষকদের উন্নয়নের ব্রত নিয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

বদিউজ্জামান বাদশা ৭৫ পরবর্তী কঠিন দিনগুলোতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মুজিবীয় আদর্শের অগ্রসৈনিক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি সমগ্রবাংলাদেশে তিনি সামরিক শাসন এবং স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী আওয়ামীলীগ সভাপতি শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। রাজনীতির উজ্জ্বল নক্ষত্র বদিউজ্জামান বাদশা তাঁর বলিষ্ঠনে তৃত্ব,  দক্ষ সাংগঠনিক ক্ষমতার বদৌলতে পরবর্তিতে ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সহ-সভাপতি, কৃষক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ- সভাপতি, নালিতাবাড়ী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাসোসিয়েশন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা উপকমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।তিনি এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে ময়মনসিংহ জেলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন। নালিতাবাড়ীতে তিনি হাজী নূরুল হক নন্নী-পোড়াগাঁও মৈত্রী কলেজ, নালিতাবাড়ী ডায়াবেটিক সমিতি প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক, পেশাজীবী সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই এসোসিয়েশন এর নির্বাহী সাধারণ সম্পাদক হিসেবে কৃষিবিদদের নেতৃত্ব দিতেন, ভালোবাসার ছায়া তলে আগলে রাখতেন।কৃষিবিদ দের বিভিন্ন ন্যায্য দাবি আদায়ে তিনি অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন, বিভিন্ন ফোরামে তাঁর অকুতোভয় স্পষ্ঠভাষা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়।নবীন প্রবীন সকল কৃষিবিদদের সাথে তাঁর ছিল মধুর সম্পর্ক ও সক্ষতা। কৃষিবিদদের কাছে ডাকতেন, পাশে থাকতেন, সকলের খোঁজ খবর নিতেন, সমস্যা সমাধানের জন্য তৎপর থাকতেন।

২২ নভেম্বর, ২০২১ শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বরেণ্য রাজনীতিবিদ ও সাবেক ছাত্রনেতা বরেণ্য কৃষিবিদ বদিউজ্জামান বাদশা ইন্তেকাল করেন (ইন্না-লিল্লাহি-ওয়া-ইন্না-ইলাহি-রাজিউন)। ঢাকার কৃষিবিদ ইনষ্টিটিউট বাংলাদেশ চত্তরে তার প্রথম নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।

দ্বিতীয় জানাযা বাদ যোহর বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ ও বাদ মাগরিব নালিতাবাড়ী তারাগঞ্জ হাইস্কুল মাঠে তার তৃতীয় নামাজে জানাযা শেষে পৌরশহরের সিট পাড়া কবর স্থানে তাকে দাফন করা হয়।শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে জন নেতার জানাজায় লোকে-লোকারণ্য ছিল উপজেলা সদর এলাকা। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে দলে দলে জানা যায় যোগ দিয়েছিল আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা। তারাগঞ্জ হাইস্কুলের বিশাল মাঠে তিলধারণের ঠাঁই ছিলনা। স্থানীয়নেতারা, জনপ্রতিনিধিরা ও জনসাধারণ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন।

একজন মানুষের মৃত্যু হলে তার পরিবার ক্ষতি গ্রস্তহয়। কিন্তু কৃষিবিদ বদিউজ্জামান বাদশার মৃত্যুতে দেশের সকল মানুষ ক্ষতি গ্রস্ত হলো।

কৃষিবিদদের গর্ব ও অহংকার কৃষিবিদ বদিউজ্জামান বাদশা ভাই আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। কৃষিবিদ জগত থেকে হারিয়ে গেলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। বদিউজ্জামান বাদশা শুধু একজন ব্যক্তিনন, একটি রাজনৈতিক প্রতি ভারনাম। তিনি ছিলেন সকল কৃষিবিদের চোখের মণি। তথ্যে-উপাত্তে সমৃদ্ধ অনর্গল বক্তৃতা দেওয়ায় সক্ষম বাদশাভাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রাঞ্জল শব্দচয়নে বক্তৃতা দিয়ে দর্শক-শ্রোতাদের মন্ত্র মুগ্ধের মত আকর্ষণ করার মত একজন জননে তা ছিলেন। অত্যন্ত জনবান্ধব, গণমুখী ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একনিষ্ঠ অনুসারী একজন জন প্রিয় নেতা ছিলেন।

আজীবন সংগ্রামী এই নির্লোভ এবং ত্যাগী মানুষটি অনেকটা অবমূল্যায়িত হয়ে অস্ফুটো গোলাপের মত অকালেই ঝরে গেলেন।

প্রতিবছর ১৩ই ফেব্রুয়ারী আসবে, কৃষিবিদ দিবস পালিত হবে, সারাদেশ ব্যাপি কৃষিবিদদের বিভিন্ন মিলন মেলা হবে কিন্তু প্রিয় বাদশা ভাইকে দেখা যাবেনা, তাঁর তথ্য-সমৃদ্ধ মনো মুগ্ধকর বক্তৃতা শোনার সৌভাগ্য হবেনা।

ব্যাক্তি বদিউজ্জামান বাদশা আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তাঁর আদর্শ, মতাদর্শ, ত্যাগ, শিক্ষা আজ আমাদের নিকট দিবালোকের মত সুস্পষ্ট। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হোক প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, তাঁর গুনাবলীর চর্চা হোক সর্বস্তরে- দেশ থেকে দেশান্তরে, সৃষ্টি হোক অসংখ্য ত্যাগি বর্ষিয়ান জননেতার আর তাঁদের মাঝেই বেঁচে থাক আমাদের সকলের প্রিয় বদিউজ্জামান বাদশা ভাই। বাদশা ভাই আছেন, থাকবেন আমাদের সকলের অস্তিত্বের মাঝে। তিনি থাকবেন সংগ্রামে, চেতনায়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবীত অবিচলিত আমৃত্যু পথচলায়।

লেখকঃ প্রকল্পপরিচালক, কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতি উন্নতকরণ প্রকল্প। কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ি, ঢাকা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে