শাহাদাত হোসাইন তসলিম: সকল মৃত্যুই বেদনার। কিন্তু করোনাকালীন মৃত্যু এবং প্রিয়জন হারানোর এই ক্ষত হয়তো কখনোই শুকাবে না। বাংলাদেশে করোনা আক্রমণের শুরুর দিকে করোনা আক্রান্ত মৃত ব্যক্তির পরিবারের অসহায়ত্ব স্বচক্ষে না দেখলে অনুধাবন করা অনেক কঠিন ছিল। আল-রশীদ ফাউন্ডেশন করোনা আক্রান্ত মৃতদেহ দাফন/সৎকারের ধর্মীয় ও মানবিক দায়িত্ব পালন শুরু করেছে এপ্রিল ২০২০ সাল থেকে এবং এখনো চলমান। মৃতদেহ যখন হাসপাতালের করোনা ইউনিটের বিছানায়। প্রিয়জন সেখানে যেতে পারছিলেন না। হাসপাতালের গেইটে অপেক্ষা করেন অসহায় অবস্হায়। আত্মীয় স্বজন কেউ পাশে ছিল না।মৃত ব্যাক্তির পরিবারের সদস্যদের পক্ষ থেকে দাফনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়ার মত মানসিক সক্ষমতাও ছিল না।

স্বাভাবিক সময়ে অনেক আত্মীয় স্বজন থাকেন দাফন কার্যে সহযোগিতা বা শান্তনা দেয়ার জন্য। মৃতদেহ দাফনের সকল সিদ্ধান্ত ও ব্যবস্হাপনাও স্বাভাবিক সময়ে পাড়াপ্রতিবেশী বা আত্মীয় স্বজনগন করে থাকেন। কিন্তু করোনার শুরুর সময়ে সাধারণত আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশী কেউই পাশে ছিলেন না। এমনি কঠিন সময়ে আল-রশীদ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকগণ হাজির হন, শুধুমাত্র দাফন নয় বরং অসহায় পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো, ধর্মীয় দায়িত্ব এবং সর্বোপরী মানব কল্যানের মহান ব্রত নিয়ে। সমাজের প্রায় সকলেই যখন করোনায় আক্রান্ত হবার ভয়ে ভীত শংকিত ছিল। পিতামাতার লাশ ফেলে সন্তানের পলায়ন, আত্মীয় স্বজন লাশ দাফনে সহযোগিতা করতে অপারগতা প্রকাশ করে, তখনই আল-রশীদ ফাউন্ডেশন মহান আল্লাহর উপর ভরসা করে নির্ভয়ে এগিয়ে এসেছিল করোনা আক্রান্ত মৃতদেহ দাফনে।

মৃতদেহ হাসপাতাল বা বাসা থেকে গ্রহন করে বিশ্ব স্বাস্হ সংস্হা (WHO) এবং বাংলাদেশের IEDCR এর গাইড লাইন অনুসারে জীবানুমুক্তকরণ, গোসল, কাফন, জানাজা এবং নিজস্ব এ্যাম্বুল্যান্সে গোরস্হানে নিয়ে দাফন করার সম্পুর্ন কাজটি বিনা খরচে সম্পন্ন করে চলেছে আল-রশীদ ফাউন্ডেশন। পরিবারের সদস্যগণ যদি থাকেন, তাহলে তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে অথবা পরিবারের কোন সদস্য না থাকলে দায়িত্ব নিয়েই আল-রশীদ ফাউন্ডেশন এ মানবিক সেবাটি করছে স্বাস্হ্য মন্ত্রনালয়ের সাথে সমন্বয় করে। করোনা আক্রান্ত মৃতদেহ দাফনের দু:সাহসিক মানবিক কাজের জন্য আল-রশীদ ফাউন্ডেশন ইতিমধ্যেই International Committee of the Red Cross(ICRC) এবং বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি কর্তৃক প্রশংসিত ও সংবর্ধিত হয়েছে।

বাংলাদেশে করোনা মহামারির শুরু থেকে এখনো পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত মৃতদেহ দাফন এর কাজটি নিরলসভাবে করে চলেছে আল-রশীদ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবকগণ। মহিলা মৃতদেহ গোসল ও কাফনের জন্য রয়েছে আমাদের মহিলা স্বেচ্ছাসেবক। মুসলিম মৃতদেহ সম্পুর্ন ইসলামিক রীতি অনুসারে গোসল, কাফন, জানাজা ও দাফনের জন্য আমাদের টিমে রয়েছে অভিজ্ঞ আলেম। ধর্মীয় রীতি নীতি এবং আন্তরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও মৃতদেহের পারিবারিক সদস্যের মতই দরদ দিয়েই দাফনের কাজটি সম্পন্ন করি আমরা। মুসলিম ব্যতিত অন্যান্য ধর্মের মৃতদেহ আমাদের লাশবাহী এ্যাম্বুলেন্সে করে পৌছে দেই সৎকারের নির্দিষ্ট স্হানে। সম্পূর্ন সেবাটিই আমরা দিয়ে থাকি বিনা খরচে মানব কল্যানে।

বিশ্বে করোনার আতংকিত মহামারির সময়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নিমিত্তে করোনা আক্রান্ত মৃতদেহের পরিবারের যন্ত্রনাদায়ক অসহায় সময়ে যখন কেউ এগিয়ে আসে নাই, আমরা তখন দু:সাহসিক ধর্মীয় ও মানবিক দায়িত্ব পালনে রাতদিন নিরলসভাবে কাজ করে চলেছি। শুধুমাত্র মৃতদেহ পরিবহন, গোসল, কাফন, জানাজা,দাফন নয় বরং করোনায় প্রিয়জন হারানো পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো, শান্তনা দেয়া, মানসিক শক্তি দেয়া, মৃতদেহ দাফনের সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করা ইত্যাদি দায়িত্ব পালন করে চলেছে আল-রশীদ ফাউন্ডেশন। আমাদের এই মানবিক কার্যক্রম চলমান থাকবে যতক্ষন এই সেবা মানুষের প্রয়োজন হবে। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

লেখক: চেয়ারম্যান, আল-রশীদ ফাউন্ডেশন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে