ইকবাল আহমেদ লিটন : বাঙালির স্বাধীন জাতিসত্তার অমর ব্যক্তিত্ব জাতির পিতা ও স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে বজ্রকণ্ঠে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” এই বলে। তাঁর সেই ঘোষণার সাথে সাথে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মুক্তিপাগল মানুষ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিয়েছিল। সেদিন যেন ক্ষ্যাপা দুর্বাশার মতো মুক্তির উতুঙ্গু নেশায় মেতেছিল পুরো বাঙালি জাতি। তখন বাংলার আবাল বৃদ্ধ-বণিতা সবার মুখে স্লোগান ছিল “বীর বাঙ্গালি অস্ত্র ধর – বাংলাদেশ স্বাধীন কর।”, তোমার আমার ঠিকানা – পদ্মা, মেঘনা, যমুনা “, “আমার দেশ তোমার দেশ – বাংলাদেশ বাংলাদেশ”,”তোমার নেতা আমার নেতা – শেখ মুজিব শেখ মুজিব”, জয় বাংলা বাংলার জয়” স্লোগানে বাংলার জনপদ ছিল মুখরিত। নয়মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ত্রিশ লক্ষ মানুষ আর দু’লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাঙালি ছিনিয়ে আনে স্বাধীনতার লাল সূর্য।

একাত্তরের ২৫শে মার্চ মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হলেও এর পটভূমি তৈরি হয়েছিল পাকিস্তানী শাসন-শোষণের তেইশ বছর সময়কালে। ২৫ মার্চ রাতের আঁধারে পাকিস্তানি সামরিক চক্রের আকস্মিক আক্রমণ ও গণহত্যার মুখে নিরস্ত্র বাঙালিকে প্রায় কোন ব্যাপক পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই মুক্তিযুদ্ধ শুরু করতে হয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব কমই ঘটেছে, যখন কোন ব্যাপক প্রস্তুতি বা চূড়ান্ত সাংগঠনিক তৎপরতা ছাড়াই একটি বিরাট আকারের সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্ম হয়েছে। সামান্য কিছু বিভ্রান্ত মানুষ ছাড়া দেশের সিংহভাগ জনগণ মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিল। নইলে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সাহায্য সত্ত্বেও মাত্র নয় মাসে পৃথিবীর অন্যতম শক্তিধর পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে কুপোকাত করা সম্ভব ছিল না। আমার ধারণা অন্তত ছয়টি ঐতিহাসিক পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের এই পটভূমি সৃষ্টি হয়েছিল।

‘৪৭ পূর্ব সময়ে বাংলার মুসলমান এলিটগণ পাকিস্তানের মাধ্যমে অগ্রসর হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিযোগিতামুক্ত যে অর্থনৈতিক স্বপ্ন দেখেছিল পাকিস্তান সৃষ্টির অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তা ভুল প্রমাণিত হতে থাকে। এ বিষয়ে লক্ষণীয় যে, পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনসংখ্যার শতকরা ৫৪ ভাগ হওয়া সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাঙালির কোন অধিকার ছিলনা। অর্থনৈতিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে চরম শোষণের মাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানের একটি উপনিবেশ হিসেবেই ব্যবহার করা হচ্ছিল। এই হতাশা মোহমুক্তির ফলে পাকিস্তানের সংবিধানের খসড়া প্রণয়নের জন্যে গণপরিষদ কর্তৃক নিযুক্ত মূলনীতি কমিটির প্রথম খসড়ার বিরুদ্ধে বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে বাঙালির রাজনৈতিক সচেতনতা উন্মেষের প্রথম পর্যায়টির সূচনা ঘটে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতিসত্তার দ্বিতীয় রাজনৈতিক স্ফুরণ ঘটে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার শাসন ক্ষমতার কেন্দ্রমূলে অধিষ্টিত নিতান্ত সংখ্যালঘু এলিট শ্রেণীর ভাষা উর্দুকে শতকরা ৫৪ জন অউর্দু ভাষী সংখ্যাগরিষ্ঠের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ থেকেই ভাষা আন্দোলনের সৃষ্টি হয়েছিল। বাঙালির সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র‍্য চেতনায় ভাষা আন্দোলনের বিশেষ প্রভাব ছিল বলেই ‘৭১ এর ২৬ মার্চ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ গঠিত হবার পর ৪২ দফা দাবি সম্বলিত এক কর্মসূচি প্রকাশ করে। দাবিগুলোর মূল বক্তব্য ছিল ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলার জন্যে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা। ১৯৫৪-তে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের মাধ্যমে তৃতীয় পর্যায়ের সূচনা হয়। নির্বাচনের পটভূমি আওয়ামী লীগ ও কতিপয় ক্ষুদ্রদল একত্রিত হয়ে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে একটি যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। যুক্তফ্রন্ট ২১ দফা দাবি নিয়ে নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়। এই ২১ দফার একটি দফায় পূর্ব বাংলার জন্যে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি এবং বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করার দাবি পূর্ণব্যক্ত করা হয়। এই একুশ দফা দাবির প্রতি বাংলার আপামর জনগণের কি পরিমাণ সমর্থন গড়ে উঠেছিল নির্বাচনের ফলাফলেই তা প্রত্যক্ষ করা যায়। ৩০৯ টি আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট লাভ করে ২২৩টি এবং মুসলিম লীগ পায় ৯টি আসন।

পঞ্চাশ থেকে ষাট দশকের শেষ পর্যন্ত পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি সৃষ্টিতে চতুর্থ পর্যায়ের সূচনা করেছিল। এ পর্যায়েই বাঙালির মুখপাত্র হিসেবে আওয়ামী লীগের অবস্থান নিশ্চিত হয়ে যায়। ১৯৫৬’র সংবিধানে শক্তিশালী কেন্দ্রের প্রাধান্য থাকায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের যে কাঠামো তৈরী হয় তার মাধ্যমে সমষ্টিগত বাঙালির স্বার্থ আদায় বা পূর্ব বাংলার সামগ্রিক উন্নতি সম্ভব নয়। ফলে, এ সংবিধানকে ঘিরে বাঙালির অসন্তোষ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একাংশ তখন ঘোষণা করে যে, পূর্ব বাংলাকে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার কথা ভাবতে হবে। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত ছিল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের কাল। এ সময়ের ঘটনাবলি বাঙালির স্বাতন্ত্র‍্য চেতনাকে শাণিত করেছিল। ‘৬২ -এর সংবিধান বিরোধী ও শিক্ষা কমিশন বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ঘটনাবলির সূত্রপাত। একই সময়ে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের নেতৃত্বে একটি গোপন ধারা(নিউক্লিয়াস) গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের লক্ষ্যে। পরবর্তীকালের প্রতিটি আন্দোলনে এ ধারাটি ছিল খুবই তৎপর। ‘৬৩ সালে সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু হলে সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগকে গণভিত্তিক দল হিসেবে পূনরুজ্জীবিত করেন তাঁর অসামান্য সাংগঠনিক ক্ষমতার প্রভাবে। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ এবং এর ফলে পূর্ব বাংলার নিরাপত্তা সংক্রান্ত অসহায়ত্ব বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই মুজিব ঘোষণা করেন, “যুদ্ধের পর স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানকে সকল দিক দিয়ে আত্ননির্ভরশীল করার সময় এসেছে।” এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি যে রাজনৈতিক কর্মসূচির ইঙ্গিত করেছিলেন তা ‘৬৬ এর ছয় দফা হিসেবে উপস্থাপিত হয়।

দফাগুলো ছিল- 

১. লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান ফেডারেশন;
২. ফেডারেশন সরকারের হাতে থাকবে দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত ক্ষমতা,অবশিষ্ট বিষয়সমূহ থাকবে প্রদেশের হাতে;
৩.দুই প্রদেশের জন্যে পৃথক কিন্তু সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রার প্রচলন করতে হবে;
৪. সকল প্রকার কর ধার্য ও আদায় করার ক্ষমতা থাকবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে;
৫. দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পৃথক হিসাব রাখতে হবে; ৬.পূর্ব পাকিস্তানে প্যারামিলিটারী বাহিনী গঠন করতে হবে। আওয়ামী লীগের এই ৬ দফা শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও সংগ্রামী ছাত্র সমাজের দূর্বার আন্দোলনের গতিশীলতা অল্পকালের মধ্যেই এই কর্মসূচিকে সকলস্তরের বাঙালির ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বলিষ্ঠ ঘোষণায় পরিণত করেছিল। ছয় দফা আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় ভীত পাকিস্তানী শাসকচক্র শেখ মুজিবকে ফাঁসানোর লক্ষ্যে ‘৬৬ এর ডিসেম্বর মাসে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করে। এ মামলায় শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবর্গ ও বেশ কিছু বাঙালি সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাকে কারারুদ্ধ করে।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ও তার প্রতিক্রিয়া হিসেবে যে বিস্ফোরণ উন্মূখ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তা মুক্তিযুদ্ধের পটভূমির পঞ্চম পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ গ্রেফতার হবার পর বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলন স্তিমিত না হয়ে আরও দূর্বার হয়ে ওঠে। ‘৬৮ এর ডিসেম্বর মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি। এই কমিটি সমাজতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত ১১ দফা দাবি প্রণয়ন করে। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল ব্যাংক-বীমা ও বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ, কৃষকদের কর মওকুফ, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি প্রদান এবং সিয়াটো-সেন্টো চুক্তি প্রত্যাহারসহ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের দাবি। পরবর্তীতে ছয় দফা ও এগারো দফার মিলিত কর্মসূচি ভিত্তিক এক দুর্বার গণআন্দোলন গড়ে উঠতে থাকে। ‘৬৯ এর ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদ পুলিশের গুলিতে নিহত হলে তাঁকে শহীদ ঘোষণা করা হয় এবং ১১ দফা দাবি আদায়ের শপথ নিয়ে ২৪ জানুয়ারি ‘গণঅভ্যুত্থান দিবস’ ঘোষণা করা হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলার অন্যতম আসামী সার্জেন্ট জহরুল হক হাজতে বন্দী অবস্থায় নিহত হন। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে জনৈক পাকিস্তানী সামরিক অফিসার কর্তৃক নিহত হন।

এ সমস্ত ঘটনার ক্রমপুঞ্জিভূত প্রভাবে চলমান আন্দোলন আরও বেগবান ও উত্তাল তরঙ্গের সৃষ্টি করে। সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়া এই গণঅভ্যুত্থানের ফলে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয়। শেখ মুজিবও মুক্তি পান। কারামুক্ত শেখ মুজিব ‘বঙ্গবন্ধু’ অভিধায় ভূষিত হন। বাঙালির আন্দোলনের অগ্রগতি লক্ষ্য করে বঙ্গবন্ধু অভিভূত হয়ে পড়েন এবং নিজের অবস্থান দেখতে পান একেবারে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে। গণঅভ্যুত্থানের সফল পরিসমাপ্তি শুধু আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তিই ছিলনা, বরং স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পতনকেমও অনিবার্য করে তুলেছিল। আইয়ুবের স্থলাভিষিক্ত হন আরেক সামরিক স্বৈরশাসক ইয়াহিয়া খান। তিনি পাকিস্তানের উভয় প্রদেশের বিস্ফোরণমুখ রাজনীতিকে ধামাচাপা দেয়ার উদ্দেশ্যে তড়িঘড়ি করে ‘৭০ এর অক্টোবরে সাধারণ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। ‘৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্বপাকিস্থানের জন্য নির্ধারিত ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে জয় লাভ করে ৩০০ আসন বিশিষ্ট জাতীয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

নির্বাচনের রায় অনুসারে কেন্দ্রে সরকার গঠনের অধিকার ছিল আওয়ামী লীগের কিন্তু ‘৭১ এর ১লা মার্চ ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলে এই অধিকার অর্জন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ইয়াহিয়ার এই ঘোষণার ফলে সারা বাংলাদেশ জুড়ে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে শুরু হয় অহিংস অসহযোগ আন্দোলন। যা ২৫শে মার্চ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বিশাল জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যে ঘোষণা দেন- তারই প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায় সূচিত হয়।

২৫ মার্চ রাত এগারোটায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। রাত দেড়টায় বঙ্গবন্ধুকে তাঁর বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু তার পূর্বেই তিনি ইপিআর এর ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সর্বত্র প্রচারের জন্য চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে (জহুর-সিদ্দিকী-এম.এ.হান্নান) যে বার্তাটি পাঠান তা ছিল, “এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা। আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। বাংলাদেশের মানুষ যে যেখানে আছেন, আপনাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর দখলদারির মোকাবিলা করার জন্য আমি আহবান জানাচ্ছি। পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলাদেশের মাটি থেকে উৎখাত করা এবং চূড়ান্ত বিজয় না হওয়া পর্যন্ত আপনাদেরকে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে।” রাজনৈতিক গতিধারায় ঐতিহাসিকভাবে এই বার্তা ছিল চূড়ান্ত স্বাধীনতার ঘোষণা। চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা এম.এ.হান্নান বার্তাটি তৎক্ষণাৎ চট্টগ্রাম শহর এলাকায় মাইকে প্রচারের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু রাত গভীর হওয়ায় অধিকাংশ মানুষ ঘোষণাটি শুনতে পায়নি। ফলে, হান্নান সাহেব ঘোষণাটি পুনঃপ্রচারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এ বিষয়ে অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সাথে শলাপরামর্শ করেন এবং পরদিন ২৬ মার্চ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বৈঠক করে এম.এ.হান্নানের নেতৃত্বে একদল আওয়ামী লীগ নেতা-সংগঠক ও ছাত্রনেতা সমন্বয়ে চট্টগ্রাম বেতারের কর্মীসহ কালুরঘাট ট্রান্সমিটার থেকে এম.এ.হান্নান স্বকণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণাটি চট্টগ্রাম বেতারে পাঠ করেন। ঐদিনই এম এ হান্নানসহ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্ত নেন যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে থাকা বাঙালি সেনাবাহিনীরা যাতে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরে এবং সাধারণ মানুষও যাতে উদ্বুদ্ধ হয় তার জন্য একজন সেনা অফিসারকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার বার্তাটি বেতারের মাধ্যমে প্রচার করতে হবে।

এ সিদ্ধান্ত মোতাবেক তৎক্ষণাৎ যুদ্ধরত ও পূর্ব থেকে সংযোগ রক্ষাকারী ক্যাপ্টেন রফিক এর সাথে যোগাযোগ করা হয় এবং বিশদ ব্যাখ্যার পর ক্যাপ্টেন রফিকের অনুরোধে মেজর জিয়াকে দিয়েই ঘোষণাটি প্রচার করার পাশাপাশি দ্রুত তারা মেজর জিয়ার খোঁজে বেড়িয়ে পড়েন এবং করলডেঙ্গা পাহাড়ের কাছাকাছি একস্থানে এসে জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁদের এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। পরেরদিন ২৭ মার্চ আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ এবং বিপ্লবী বেতারকেন্দ্রের কর্মীরাসহ মেজর জিয়াকে সাথে নিয়ে কালুরঘাট বেতার উপকেন্দ্রে আসেন এবং বেতার কর্মী বেলাল মোহাম্মদের তত্ত্বাবধানে মেজর জিয়াকে দিয়ে যে ঘোষণাটি প্রচার করা হয় তা ছিল “আমি মেজর জিয়াউর রহমান আমাদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করছি। দেশের প্রত্যেক সামরিক ও বেসামরিক মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে শত্রুর মোকাবেলা করার আহবান জানাচ্ছি।” তবে ২৭ মার্চ তিনি একটা ঘোষণা দেন-যা তৎকালীন নেতৃবৃন্দ তাঁকে এটা বাতিল করে নতুনভাবে ঘোষণা করার কথা বলেন। এটাই হচ্ছে জিয়ার সে ঘোষণা, যে ঘোষণাকে নিয়ে তাঁর অনুসারীরা এখন বাগাড়ম্বরে লিপ্ত হয়েছে। এ ঘোষণাকে পুঁজি করেই তারা নতুনভাবে আবিষ্কার করেছে স্বাধীনতার ঘোষকতত্ত্ব। স্বাধীনতার পরবর্তী এবং বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পরে জিয়ার মনে রাজনৈতিক অভিলাষ জাগ্রত হলেও নিজে স্বাধীনতার ঘোষক বলে দাবি করতে কখনোই শোনা যায়নি। জিয়া বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন। কিন্তু পরে তাঁর অনুসারীরা এটাকে ধামাচাপা দিয়ে আসল সত্যকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন। মেজর পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়া দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছেন। তাই দেশের মানুষ তাঁকে চিরদিন শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে তিনি নিজের সামরিক অভিজ্ঞতায় মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডারও হয়েছিলেন।

সেই হিসেবে তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এটা যেমন ইতিহাসের নির্জলা সত্য তেমনিভাবে তাঁকে যদি কেউ স্বাধীনতার ঘোষক বানানোর অপচেষ্টায় লিপ্ত হয় তাহলে সেটা হবে নির্জলা মিথ্যা। কোনো কিছুকে যদি রাবারের বেলুনের মতো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বাড়ানোর চেষ্টা করা হয় তাহলে সেটা অচিরেই ফুটো হয়ে আস্থাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। ২০০৪ সালে তৎকালীন সরকার স্বাধীনতার ঘোষকতত্ত্বটিকে তাদের দলীয় রাজনীতির বিকাশে বীজ আকারে রোপন করার জন্য স্কুলের পাঠ্যসূচি থেকে শুরু করে রেডিও, টিভি এবং সর্বপ্রকার মিডিয়ার মাধ্যমে চেষ্টা করা হয়েছে সেই সাথে বঙ্গবন্ধুর নাম ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলার জন্য ইতিহাসবিকৃতির আশ্রয় নিয়েছিলেন। তখন এর প্রতিবাদে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে, আদালতে মামলা হয়েছে। আদালত রায় দিয়েছে বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার একমাত্র ঘোষক। বঙ্গবন্ধুর নাম ইতিহাস থেকে কেউ টলাতে পারবেনা। কারণ ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতেই চলে। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।

জিয়ার ভাষায় বঙ্গবন্ধুর পক্ষে ঘোষণা দেওয়ার কথা বলা আছে; সেই অংশটুকু আড়াল করে বাকি অংশটা প্রচার করে তারা যেমন তাদের রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি আর হীনমন্যতার পরিচয় দিয়েছে। সেই সাথে সত্যের অপলাপ আর মিথ্যার বেসাতি মিশ্রিত ইতিহাসের নগ্ন বিকৃতির মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে বিপথগামী করার চেষ্টা করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা পাঠ করে কিংবা বঙ্গবন্ধুর নামে ঘোষণা দিয়ে যদি কেউ রাতারাতি নিজেই ঘোষক হয়ে যান তাহলে পাকিস্তানি শাসন শোষণের বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ ২৩ বছরব্যাপী আন্দোলন সংগ্রামও সব মিথ্যা হয়ে গেল? মনে রাখতে হবে মঁয়ুরপুচ্ছ পরিধান করলেই মঁয়ুর হওয়া যায় না, কারো নামে ঘোষণা পাঠ করেও ঘোষক হওয়া যায় না। এটাই হবে একদিন ইতিহাসের নির্মম সত্যপাঠ। বস্তুত সেদিন (৭ই মার্চ)বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠ থেকে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের গর্জনরুপে যা বেরিয়েছিল তা ছিল সুদীর্ঘ তেইশ বছরব্যাপী পাকিস্তানি শাসন শোষণ আর জুলুম নির্যাতনে অতিষ্ঠ ও পুঞ্জীভূত প্রচন্ড ক্ষোভের ভয়ংকর বিস্ফোরণ।

লেখক : সদস্য সচিব
আয়ারল্যান্ড আওয়ামী লীগ
-ইকবাল আহমেদ লিটন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে