মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া: সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার প্রবণতা ও হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশেও এ প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। গবেষক ও অপরাধবিজ্ঞানীরা নানাভাবে এর ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন।

আত্মহত্যার অন্যতম কারণগুলো হচ্ছে- বিভিন্ন কারণে হতাশা, ব্যর্থতা, অবহেলিত বা প্রতারিত হওয়া, লোকলজ্জার ভয়, দীর্ঘ অসুস্থতা ইত্যাদি। কিশোর ও যুবক-যুবতীদের অনেকে প্রেমে ব্যর্থতা, ধর্ষণের শিকার হওয়া, একাডেমিক পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল করতে না পারা, এমনকি নিকটজনদের সঙ্গে অভিমান করেও আত্মহননের পথ বেছে নেয়।

বাংলাদেশ পুলিশের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালে দেশে আত্মহত্যার কেস ছিল ১০ হাজার ৫০০; ২০১৬ সালে ১০ হাজার ৬০০ এবং ২০১৭ সালে ১১ হাজার ৯৫টি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ সংখ্যা গড়ে ১৫ হাজারের মতো হতে পারে বলে অনেকের ধারণা। সে হিসাবে দেশে দৈনিক প্রায় ৪০ জন আত্মহত্যা করে। আবার অনেক আত্মহননের কেস পুলিশের কাছে রিপোর্টও হয় না।

বিপদজ্জনক এ প্রবণতা রোধে করণীয় সম্পর্কে আমাদের সমাজ, অভিভাবক, মিডিয়া-সবারই চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার প্রসার ও ব্যাপক প্রচারণা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় বলে আমি মনে করি।

পৃথিবীর সব ধর্মেরই বিধান হলো-আত্মহত্যা মহাপাপ। অবশ্য নাস্তিকদের বিষয়ে কোনো বিধান নেই, কারণ তারা মহাজ্ঞানী-বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মনগড়া ব্যাখ্যা রয়েছে। আমাদের দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী বিবেচনায় আত্মহত্যা বিষয়ে দ্বীন ইসলামের কিছু বিধিনিষেধ কোরআন ও হাদিসের আলোকে জানা প্রয়োজন।

সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা নিজেদের হত্যা করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু এবং যে কেউ সীমা লঙ্ঘন করে অন্যায়ভাবে তা (আত্মহত্যা) করবে, তাকে অগ্নিতে দগ্ধ করব, এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ’ (সূরা আন-নিসা, আয়াত ২৯-৩০)। কুরআনে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ঘোষিত হয়েছে, ‘তোমরা নিজের হাতে নিজেদের জীবনকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না (সূরা আল বাকারা, আয়াত : ১৯৫)।

মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে পাহাড়ের উপর থেকে নিক্ষেপ করে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামের মধ্যে সর্বদা ওইভাবে লাফিয়ে পড়ে কষ্ট পেতে থাকবে। যে ব্যক্তি বিষপান করে আত্মহত্যা করে, সে জাহান্নামের মধ্যে সর্বদা বিষপান করে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করবে। আর যে ধারালো অস্ত্র দ্বারা আত্মত্যা করে, তার কাছে জাহান্নামে সেই ধারালো অস্ত্র থাকবে, যা দ্বারা সর্বদা সে নিজের পেট ফুঁড়তে থাকবে’ (বুখারি ও মুসলিম)।

নবী করিম (সা.) আত্মহত্যার শাস্তি ঘোষণা করে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি যে জিনিস দ্বারা আত্মহত্যা করে, পরকালে তাকে সে জিনিস দ্বারাই শাস্তি দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে, দোজখে অনুরূপভাবে নিজ হাতে ফাঁসির শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। আর যে বর্শা ইত্যাদির বা অন্য কোনো ধারালো অস্ত্রের দ্বারা আত্মহত্যা করে, সে দোজখেও সেভাবে শাস্তি পাবে (নাসাঈ, তিরমিজি)।

নবী (সা.)-এর দরবারে এক লোককে হাজির করা হয়, তীরের ফলা দ্বারা যে নিজেকে হত্যা করেছে। তখন তিনি তার জানাজা নামাজ পড়াননি (মুসলিম, ৯৭৮)। এভাবে কুরআন ও হাদিসে বহুবার আত্মহননের বিষয় নিষেধাজ্ঞা এসেছে।

যে আত্মহননের পথ বেছে নেয়, তার করুণ পরিণতি সম্পর্কে আমরা ধর্মগ্রন্থের বিভিন্ন বাণী থেকে জানতে পারি। তার রেখে যাওয়া পরিবার যে অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করে, অপমান, দুর্নাম ও হয়রানির মুখোমুখি হয়, তা খোঁজ নিলেই আমরা দেখতে পাই। ভিকটিম জানে না তার অদূরদর্শী সিদ্ধান্তে তার পরিবার কিরূপ যন্ত্রণা ভোগ করছে এবং সামাজিকভাবে কতটা হেয় হচ্ছে।

আল্লাহর আদেশ অমান্যকারীর মৃত্যু যন্ত্রণাও হয় ভয়াবহ। আমরা সেটা অনুধাবন করতে পারি না, কারণ যে আত্মহনন করে সে ফিরে এসে তার কষ্টের কথা বলে যেতে পারে না। প্রকৃত শিক্ষার অভাবে এসব হতভাগা-হতভাগীনিরা হয়তো আত্মহত্যার মাধ্যমে তার কথিত হতাশা, লজ্জা বা কষ্ট থেকে মুক্তি পেতে চায়; কিন্তু সে জানে না যে মৃত্যুযন্ত্রণা কত ভয়াবহ।

মৃত্যুর পরের জীবনে সে দুনিয়ার জীবনের তুলনায় শতগুণ কষ্ট ভোগ করবে, যে কষ্টের কোনো শেষ নেই, ক্ষমা নেই। আত্মহত্যা একটি অমার্জনীয় অপরাধ। মহান আল্লাহতায়ালা মানুষকে একবারই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য পৃথিবীতে পাঠান। আল্লাহর নেয়ামত এ জীবনটাকে মানুষ নিজে শেষ করে দেবে, তা আল্লাহ মোটেও পছন্দ করেন না। মানুষের জীবনে দুঃখকষ্ট, হতাশা, সুখ-শান্তি, সাফল্য ঘুরে ফিরে আসবেই।

দুঃখ কষ্ট ও হতাশা, খারাপ সময় ইত্যাদি ধৈর্যের সঙ্গে মোকাবিলা করে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। আত্মহত্যা তো দূরের কথা, দুঃখ-কষ্টের কারণে আল্লাহর কাছে মৃত্যু কামনা করাও যাবে না। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন (নির্ধারিত সময়ের পূর্বে) মৃত্যু কামনা না করে। কারণ, (মৃত্যু বিলম্বিত হলে) সে যদি নেককার হয়, তাহলে হয়তো তার নেক কাজের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।

আর যদি গোনাহগার হয়, তাহলে সম্ভবত সে তার কৃত পাপ (তওবার মাধ্যমে) সংশোধনের সুযোগ পাবে (বুখারি, মুসলিম)। আর এক হাদিসে রয়েছে, জীবন-মৃত্যু সম্পর্কে আল্লাহর দরবারে মানুষের প্রার্থনা যদি করতেই হয় তবে এরূপ হবে- ‘হে আল্লাহ্! আমাকে ওই সময় পর্যন্ত জীবিত রাখুন, যতক্ষণ পর্যন্ত জীবন আমার জন্য কল্যাণকর। আর আমাকে তখন মৃত্যুদান করুন যখন মৃত্যু আমার জন্য কল্যাণকর’ (বুখারি, মুসলিম)।

আল্লাহ্ সীমা লঙ্ঘনকারীকে পছন্দ করেন না। প্রত্যেক কাজেই সংযমী হওয়া জরুরি। অভিভাবকের লক্ষ রাখতে হবে তার সন্তান যেন ন্যায় ও সত্যের পথে চলে। ক্ষমতা, অর্থ, প্রতিপত্তি কিংবা ষড় রিপুর লোভে পড়ে মানুষ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়।

যুবক-যুবতীরা না বুঝে শয়তানের প্ররোচনায় অসামাজিক কাজে লিপ্ত হতে পারে। তাদের ন্যায়ের পথে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব অভিভাবক ও সমাজের। সৎ, ন্যায়ানুগ ও উন্নত জীবন গঠনের জন্য রাষ্ট্রযন্ত্র, মিডিয়া ও দেশের বুদ্ধিজীবী ও আলেম সমাজ থেকে তাগিদ ও প্রচার-প্রচারণা থাকতে হবে।

কখনো কখনো দেখা যায়, একটি মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে লোকলজ্জার ভয়, অপমান ও ধিক্কারে আত্মহত্যা করে। কখনো দেখা যায়, বিয়ের আশ্বাস পেয়ে একজন তরুণী কোনো দুশ্চরিত্রের ছেলের ভোগের শিকার হয়ে পরে প্রতারিত হয়ে স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেয়। কখনো দেখা যায়, দিনের পর দিন নানামুখী চাপ, হতাশা ও কষ্ট সহ্য করতে না পেরে কেউ আত্মহত্যা করে। আবার এমন ঘটনাও ঘটেছে, কোনো ব্যক্তি শুধু আত্মহত্যাই করছে না, সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও হত্যা করছে।

প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা থাকলে কোনো ব্যক্তি আত্মহননের পথ বেছে নেয় না, এমনকি কোনো অসামাজিক কাজেও জড়িয়ে পড়ে না। এসব ক্ষেত্রে যার বা যাদের প্ররোচনা বা অপকর্মের কারণে অপরিণত ও অনাহুত মৃত্যু ঘটে, তারা যদি ক্ষমতার জোরে, কিংবা সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে দুনিয়ার আদালতের বিচার থেকে নিষ্কৃতিও পেয়ে যায়, পরকালে আল্লাহ্র বিচার থেকে তারা কোনোভাবেই পার পাবে না। মনে রাখতে হবে, আল্লাহ্ একদিকে রহমানুর রাহিম (দয়ালু ও ক্ষমাশীল), অন্যদিকে ক্বাহ্হার (মহা পরাক্রমশালী)।

কোনো ব্যক্তি তার কৃত অপরাধের জন্য আল্লাহ্র নিকট তওবা করে ক্ষমাভিক্ষা চাইলে আল্লাহ্ মাফ করতেও পারেন। আত্মহত্যাকারী তওবার সময় পায় না, তাই ক্ষমা পাওয়ার প্রত্যাশাও করতে পারে না। পৃথিবীর অশান্তি, হতাশা, অনাচার থেকে আত্মহত্যার মাধ্যমে নিষ্কৃতি পাওয়ার আশা তাই বৃথা। বরং কেউ যদি কৃত ভুলকর্ম থেকে ফিরে এসে আল্লাহ্র সাহায্য প্রার্থনা করে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তার সহায় হন।

কেউ যদি কোনো তৃতীয় ব্যক্তির দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হন, প্রতারিত হন কিংবা আত্মহত্যায় প্ররোচিতও হন, যদি তিনি তার সমস্যাগুলো নিয়ে পরিবারের সদস্য কিংবা নির্ভরযোগ্য বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করেন ও পরামর্শ চান, তবে নিশ্চয়ই এর সমাধানের পথ খুঁজে পাবেন। তাছাড়া হতাশাগ্রস্ত, নির্যাতিত বা প্রতারিত ব্যক্তির অভিভাবক ও বন্ধু-বান্ধবদের দায়িত্ব হলো দ্রুত তাদের কাউন্সেলিং, সান্ত্বনা বা অন্য কোনো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে তাদের পাশে থাকা। এ ধরনের ক্ষেত্রে মোটেও অবহেলা করা উচিত নয়।

ধর্ষণ, প্রতারণা, নারী নিগ্রহ ইত্যাদির জন্য কঠোর আইন প্রণয়নের পাশাপাশি আইন বাস্তবায়নের দিকে নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে চাক্ষুষ সাক্ষী যেমন গুরুত্বপূর্ণ, এর অবর্তমানে পারিপার্শ্বিক অবস্থাগত সাক্ষ্যসাবুদও ন্যায়বিচারের স্বার্থে গুরুত্বসহকারে আমলে নেওয়া প্রয়োজন।

সন্তান-সন্ততিদের পারিবারিক, ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়া শুরু করতে হবে শৈশব থেকেই। আত্মহত্যার ধর্মীয় ও সামাজিক পরিণতি ও কুফল সম্পর্কে মাধ্যমিক স্কুলের আবশ্যিক পাঠ্য তালিকায় একটি পূর্ণাঙ্গ চ্যাপ্টার রাখা যেতে পারে। সর্বোপরি দেশের বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ ও মিডিয়া গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে আত্মহননের কুফল বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে সমাজের এই মারাত্মক ব্যধির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এগিয়ে আসতে পারেন।

 সাবেক সিনিয়র সচিব, বর্তমানে জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে