ইকবাল আহমেদ লিটন: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনাদর্শ থেকে আমরা সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটি পাই তাহলো সাধারণ মানুষের সেবা করার উদ্দেশ্যে নেতৃত্বদান। কিন্তু আজকের নেতৃত্বের এ দিকটাই কালের অতলগহ্বরে হারিয়ে যেতে বসেছে। তরুণ সমাজ একটা জাতির সবচেয়ে গতিশীল অংশ, অপ্রতিরোধ্য শক্তি। আগামী দিনের দেশ ও জাতির নেতৃত্ব তাদের মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসবে। জাতির সেই আগামী দিনের কাণ্ডারিদের সমীপে কয়েকটি কথা না বললেই নয় তাই আকুল আগ্রহে জাতির উদ্দেশ্যে আমার এ লেখাটি নিবেদন করছি।

দুর্ভাগা এ দেশ প্রতিনিয়ত মানবসৃষ্ট কৃত্রিম দুর্যোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধোত্তর ১৯০ বছরের পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে দেশ একবার স্বাধীন হলো ১৯৪৭ এ। আবারো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হলো ১৯৭১ এ সর্বসম্মতিক্রমে পেলাম সুন্দর পরিপূর্ণ একটা স্বাধীন দেশ। দু দুবার যে জাতির ললাটে স্বাধীনতার লাল সূর্য ঝিলমিলিয়ে উঠেছিল সে জাতির ভাগ্যাকাশ থেকে কালো মেঘের ঘনঘটা দূরীভূত হচ্ছেনা এখনো। এখনো অধিকাংশ জনগণের ভাগ্যের মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। পৌষ মাঘের হাড় কাঁপানো শীতে এখনো মানুষের রাত কাটে ফুটপাতের কোলে। প্রচণ্ড বর্ষায় মাথা গোজার ঠাঁই মেলেনা অনেকেরই। এখনো অনেকের অন্নহীনের হাহাকার আর বস্ত্রহীনের সলজ্জ আকুতি থেকে মুক্তি পায়নি দেশের সাধারণ মানুষ। স্বাধীনতার এতো বছর পরেও কেন এই অবস্থা? বঙ্গবন্ধু কি এই দেশ চেয়েছিল? আগে বিদেশীদের শোষণকে দায়ী করলেও এখন কাদেরকে দায়ী করবো ? দেশের দারিদ্রতাই কি এর জন্য দায়ী ? সম্পদের অভাবই কি এর জন্য দায়ী ? কক্ষনো নয়। হ্যাঁ, একটা জিনিসের অভাব এর জন্য দায়ী। সেই জিনিসটির নাম ‘সততা’। সততার দুর্ভিক্ষ চলছে আমাদের প্রতিটি সেক্টরে। আমরা যারা রাষ্ট্র সমাজ ও প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছি তাদের অধিকাংশই দুর্নীতির সমুদ্রে নিয়মিত অবগাহন করেই চলেছি। উচ্চ শিক্ষার পাদপীঠ থেকে শীর্ষ ডিগ্রি অর্জন করে আমরা কলমের খোঁচায় পুকুর চুরির কাজে লিপ্ত রয়েছি। মিথ্যা আর অন্যায়ের সাথে আমাদের বসবাস। সামান্য কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সমগ্র জাতি বিভ্রান্তির আবর্তে ঘূর্ণায়মান। মুল্যবোধের অবক্ষয়ের দিকে ছুটে চলছে সবাই।

দুর্নীতির এ রাহুগ্রাস থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হলে প্রয়োজন একদল সৎলোক যারা প্রশাসনের সর্ব পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করবে, সমাজের প্রতিটি সেক্টরে নেতৃত্ব দিবে। কিন্তু সৎ লোক কি রেডিমেড পাওয়া যায়? এটি কি আকাশ থেকে অবতীর্ণ হবে না বিদেশ থেকে আমদানি করে আনা যাবে? এর কোনটিই নয়। আমাদের সমাজে বসবাসরত লোকদেরকেই সৎ হয়ে গড়ে উঠতে হবে। সৎ হয়ে গড়ে উঠা সহজ কথা নয়। বিনা চেষ্টায় বাগানে আগাছা জন্মে কিন্তু গোলাপের চাষ করতে হয়। তেমনি মানুষও বিনা চেষ্টায় খারাপ হতে পারে কিন্তু সৎ হওয়ার জন্য চেষ্টা করতে হয়। আজকে যারা শিক্ষাঙ্গনে অধ্যয়নরত তারাইতো আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগর। সুতরাং শিক্ষাঙ্গনের চত্বর থেকেই যাতে সৎ নেতৃত্ব গড়ে উঠে সে প্রচেষ্টায় ব্রতী হতে হবে তোমরা ছাত্রদেরকে এখন থেকেই। তাই এখন থেকেই তোমাদের উচিত প্রতিটি পদক্ষেপে নিজে দুর্নীতি মুক্ত থাকা ও সমাজকে দুর্নীতি মুক্ত রাখার জন্য সাধ্যমতো প্রয়াস চালানো। যারা জীবনের এই ঊষালগ্নেই দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়বে তাদের কাছে জাতি ভালো কিছু প্রত্যাশা করা আর সোনার হরিণের সন্ধানে ছুটে চলা একই কথা ।

ছাত্রজীবন হলো জীবনকে গড়ে তোলার সময় , ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুতির সময়। তাই এই সময়টুকু যাতে হেলায়-ফেলায় নষ্ট না হয় সে ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। অনর্থক আড্ডা কিংবা যে কোন নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে বিরত রাখবে। অসৎ সঙ্গ থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখবে। যার কাছে যে ভালো গুনটি পাবে তা গ্রহণ করবে, খারাপটি বর্জন করবে। নেতিবাচক দিকটি গ্রহণ না করে সব সময় ইতিবাচক দিকটিই গ্রহণ করবে। এ ক্ষেত্রে তোমাদের বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত মৌমাছির মতো। মৌমাছি ফুল থেকে ফুলে ঘুরে ঘুরে শুধু মধু সংগ্রহ করে। এর বিপরীত বৈশিষ্ট্য হলো মাছির। তার কাজ যেখানে নোংরা- আবর্জনা, পচা-গলা জিনিস আছে সেখানে গিয়ে বসা। মাছির মতো নোংরা বিষয়ের দিকে তোমরা কখনো ঝুঁকে পড়োনা , বরং মৌমাছির মতো যে কোন জিনিসের সুন্দরটুকু যেন তোমাদের আরাধ্য হয়।

ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলবে। ধর্ম মানুষকে সৎ হতে শিখায়। ধার্মিকতা জাতিকে উন্নত করে। কোন ধর্মই মানুষকে খারাপের দিকে প্ররোচিত করেনা। চুরি করা হিন্দু ধর্মে পাপ, আর মুসলমান ধর্মে কি পূণ্য ? মিথ্যা বলা মুসলমান ধর্মে পাপের কাজ আর হিন্দু ধর্মে কি পূণ্যের কাজ? কখনো নয়। সুতরাং সব ধর্মই মানুষকে নৈতিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত করে। অতএব ধার্মিক হও কিন্তু ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করোনা। ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মতভেদ করে কলহ-বিবাদে জড়িয়ে পড়োনা। তোমার সাথে অপরের কি কি বিষয়ে মিল আছে সেটিকে বিবেচনায় রাখবে। ‘অমিল’ যেটুকু আছে সেটিকে বড় করে দেখবেনা। অমিলকে যদি বড় করে দেখো তবে একতা ও সংহতি প্রতিষ্ঠিত হবেনা। বিভেদ – বিশৃঙ্খলা দেশকে ভাঙতে পারে, গড়তে পারেনা। দেশ গড়ার জন্য প্রয়োজন ঐক্য ও সংহতি।

পরিশেষে বলবো, তোমরা আলোকিত মানুষ হও, তোমরা মানুষের মতো মানুষ হও। আর স্বাধীনতার স্বপক্ষের দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে মনে রাখতে হবে দেশ ও দেশের পতাকা বাঁচানোর লড়ায় তাদের আজীবন চালিয়ে যেতে হবে। সংলাপ হলো, আলোচনা হলো। এখন সংবিধান, দেশ ও মানুষকে রক্ষার জন্য প্রয়োজন সৎ, ত্যাগী নেতার। যাদেরকে সব সময় মানুষ পাশে পাবে। হুমকি দেয়া নেতা আর বামাতির মত চাপাবাজ নেতা আর আওয়ামী লীগের মধ্যে কিছু নেতা যাদের সাথে এলাকার মানুষের সম্পর্ক নাই বরং সাধারন জনগন তাদের দেখলে ভয়ে পালায় এমন নেতাদের সবসময় বর্জন করা উচিৎ। করোনা সঙ্কটকালে সব ফেরেস্তা সমতূল্য নেতাদের রুপ জনগন দেখেছে সুতরাং এমন নেতা দরকার যার কথায় মানুষ জীবনবাজি রেখে রাস্তায় নেমে আসবে আর দেশ গড়ার লক্ষ্যে সবাই ঝাপিয়ে পড়বে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপনি নির্ভিক, সৎ, পরিশ্রমী, সর্বপরি বিদ্যানন্দিনী আপনার নিজের অভিজ্ঞতা, বুদ্ধিমত্বা সহ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে এমন সোনার বাংলা গড়তে হবে যাতে আপনার অবর্তমানে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কাজ চালিয়ে নিতে পারে। বঙ্গবন্ধুকে মেরা ফেলা গেলেও তার স্বপ্ন আর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পদ্ধতিগুলো কিন্তু কেউ মেরে ফেলতে পারে নাই। যোগ্য নেতাদের আরেকটু শাণিত করে করোনা মহামারীরপর সৎ ও নির্লোভ মানুষদের নিয়ে নিজ হাতে দলের হাল ধরেন ইনশাআল্লাহ্‌- করোনা ভাইরাস আর ঘূর্ণিঝড় আম্পানের জন্য যেটুকু ক্ষতি বাংলাদেশের হয়েছে তা থেকে মুক্তি নিয়ে আমরা এগিয়ে যাবো।

লেখক: সদস্য সচিব আয়ারল্যান্ড আওয়ামী লীগ, ইকবাল আহমেদ লিটন

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে